নানান নাটকীয়তার পর নির্বাচিত সরকারের অধীনেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পার্টি। সোমবার থেকে দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করতে পারবেন দলটির নেতারা।
তবে এখনো রয়ে গেছে দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও তার ভাবি দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের ক্ষমতার লড়াই। এই যুদ্ধ কোথায় গড়াবে- সেই পরিণতি নির্দিষ্ট না হলেও এ নিয়ে দলটিতে টানাপড়েন দীর্ঘদিনের।
সবশেষ রবিবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে দলের পক্ষে ভোটের তারিখ পেছানোর অনুরোধ জানান বেগম রওশন এরশাদ। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখান দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। সংবাদ সম্মেলন ডেকে তিনি বলেন, ‘রওশন এরশাদ দলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ নন।’
এর আগে দলের মনোনয়ন প্রদানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি দাবি করে জিএম কাদের ও রওশন এরশাদের পক্ষে পৃথক চিঠি পাঠানো হয় নির্বাচন কমিশনে।
প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সহধর্মিণী বেগম রওশন এরশাদসহ সিনিয়র নেতারা শুরু থেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বলে আসলেও গত ৫ মে দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত কো-চেয়ারম্যানের বৈঠকে আসন্ন নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে বেশিরভাগ নেতা একমত হন। আসন্ন নির্বাচনে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে মতামত দেন সিনিয়র নেতারা। এরপর ১৪ নভেম্বর কাকরাইল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত জেলা নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন পার্টির শীর্ষনেতারা। সেখানেও ৫৯ জন বক্তার মধ্যে ৫৭ জনই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার পক্ষে মত দেন।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোর বিরোধী জিএম কাদের ও তার অনুসারীরা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। প্রস্তুত সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকাও। রওশনকে প্রাধান্য না দিয়ে একক মনোনয়ন ক্ষমতা ও চাহিদামত আসন নিশ্চিত করা হলে যে কোনো সময় নির্বাচনের ঘোষণা দেবেন জিএম কাদের- এমনটি জানিয়েছিলেন দলটির একাধিক নেতা।
দলটির শীর্ষনেতাদের ধারণা, জিএম কাদের জাপাকে নেতৃত্ব দিয়ে নির্বাচনমুখী না করলে সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রওশনের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ নির্বাচনে যেতে পারে জাপার ব্যানারে। এ শঙ্কা থেকেই অনেক হিসাবনিকাশ করে জিএম কাদের নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান একাধিক সিনিয়র নেতা। তবে এ অবস্থায় কৌশল কী হবে- তা নিয়ে দফায় দফায় চলেছে দলটির সিনিয়র নেতাদের বৈঠক।
এদিকে, শুক্রবার জাতীয় পার্টির মহাসচিব বরাবর একটি চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন। এতে আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টি একক না জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করবে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এর পরদিন রওশন এরশাদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি নির্বাচন কমিশন বরাবর দেওয়া হয়। এতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন অংশ নেয়ার কথা বলা হয়।
এমন চিঠির প্রসঙ্গে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রওশন এরশাদ পার্টির অথরিটি নন। তার কোনো এখতিয়ার নেই। তিনি ইসিকে চিঠি দিতে পারেন না। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব আমি। ইসির আইন অনুযায়ী রওশন এরশাদের কোনো মতামত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেটাই চূড়ান্ত।’
এদিকে ১৪ নভেম্বর দলীয় সভা শেষে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দলটির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের। তিনি আসন্ন নির্বাচনে সব দলকে আনতে সংলাপের উদ্যাগ নিতে রাষ্ট্রপতিকে আহ্বান জানান। রবিবার দুপুরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। বৈঠকে রওশন এরশাদ তফসিল পেছানোসহ পাঁচটি বিষয় রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তফসিল পেছানোর প্রস্তাব প্রসঙ্গে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ রওশনপন্থি নেতা মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘তফসিল জারিকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। তবে সময়টা অনেক কম হয়ে গেছে। তাই আমরা রাষ্ট্রপতিকে তফসিল পেছানোর জন্য অনুরোধ করেছি। জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেছেন- তিনি ইসির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করবেন।’
বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসিহ এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।
এদিকে, আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব কে দেবেন তা নিয়ে ধোঁয়াশায় রয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। তারা বলছেন, পুরোদল জিএম কাদেরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকলেও রওশন এরশাদ সরকারের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত। যদিও পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই দলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দেবর-ভাবির দ্বন্দ্ব অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় তা আবারও প্রকট হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘আমার মনে হয় না, সরকার বা রওশন এরশাদের ভয়ে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেবেন জিএম কাদের।’