• ১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ১০ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ

bijoy71news
প্রকাশিত এপ্রিল ৭, ২০২০

নুরুল হক শিপু ::
কিছু পুলিশের নেতিবাচক কর্মকান্ডের কারণে দায়ী করা হয় পুরো বাহিনীকে! প্রকৃতপক্ষে পুলিশ বলতেই কি খারাপ? পুলিশের সকল সদস্য যে ফেরেশতা তা কিন্তু বলছি না। তাহলে ১/২ জনের অপরাধে পুরো বাহিনীকেই দায়ী করা হয় কেন? অনেক ভালোর মধ্যে ২/১ টা মন্দের মিশ্রণ থাকতে পারে। হাতের পাঁচটি আঙ্গুল যেমন সমান না; তেমনি পুলিশ বাহিনীর সকল পুলিশ সদস্যও নীতিগত দিক দিয়ে এক না। সিলেটি ভাষায় একটি প্রবাদ আছে-‘ধানো ছুছা থাকাটাউ স্বাভাবিক।’ তাই বলে সবাইকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক নয়।
স্বাধীনতার যুদ্ধ থেকে দেশের অতীত ও বর্তমান ইতিহাস ঘাটলেই বুঝতে পারবেন পুলিশের ভালো মন্দের হিসেব। আমার এই লেখায় কারো কারো খুব গাত্রদাহ হবে। কারণ বিষয়টি শুধুই পুলিশ। এর মধ্যে প্রশংসা।
এইতো গত কয়েকদিন থেকে কিছু জনপ্রতিনিধির সেবামূলক কাজের পোস্ট নিজের ফেইসবুকে দিয়ে কতোজনেরই চোখের বালি হয়েছি-তা নিজে ছাড়া কেউই উপলব্ধি করেনি। জনপ্রতিনিধি আর রাজনৈতিক নেতারা দায়িত্বের বাইরে গিয়েও ভালো কাজ করেন-তা এই সমাজের এক শ্রেণির মানুষ মানতে নারাজ। যারা নারাজ তাদের বক্তব্য-মানুষের কল্যাণে কাজ করাটাই জনপ্রতিনিধি আর রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব। আজকের এই লেখাটি পড়ে ওই শ্রেণির লোকেরা হয়তো বলবে-পুলিশের এসব কাজ করাও তাদের দায়িত্ব। তাদের নিয়ে আলাদা করে লেখার কি আছে। আচ্ছা বলুনতো-নিজেদের বেতন আর রেশন অসহায়দের বিলিয়ে দেওয়া কি পুলিশের কাজ? নিজের বেতন মানুষের কল্যাণে সরকারের হাতে তুলে দেওয়া কি-পুলিশের কাজ? রাতে অন্ধকারে অসহায় মানুষের ঘরে খাবার সরবরাহ করা কি পুলিশের কাজ?
এবার আসা যাক মূল প্রসঙ্গে-গোটা বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাসের করাল গ্রাসে বিধ্বস্ত; তখন দেশ তথা সিলেট মহানগর পুলিশকে নিয়ে প্রশংসা করে লেখা অনেককেই মর্মাহত করতে পারে। কেউ কেউ এই লেখা পড়ে আমাকে গালিও দিতে পারেন!

পুলিশ গণমাধ্যমের সংবাদ শিরোনাম হয় সাধারণত নেতিবাচক কর্মকান্ডের জন্য। কিন্তু সেসব খবর ছাপিয়ে এখন গণমাধ্যমেই শুধু নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা প্রশংসিত হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ যখন মারাত্মক এক ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এ দুঃসময়ে দেশ রক্ষায়, দেশের মানুষকে রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এই পুলিশ বাহিনীই।
এই দুঃসময়ে পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বিপিএম (বার) প্রধানমন্ত্রীর ত্রান ও কল্যাণ তহবিলে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে ২০ কোটি টাকা আর্থিক অনুদান প্রদান করেছেন। অনুদানের এই অর্থের মধ্যে রয়েছে কনস্টেবল হতে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত সদস্যদের শুধুমাত্র একদিনের বেতন। এছাড়া, এই অর্থের মধ্যে এএসপি হতে আইজিপি পর্যন্ত সকল সদস্যের একদিনের বেতন ও বৈশাখী ভাতা ছাড়াও পুলিশ অফিসার্স এসোসিয়েশন হতে অনুদান এবং পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট হতে অনুদান রয়েছে। এটি হলো পুরো পুলিশ বিভাগের করা ত্যাগের একটি দৃষ্টান্ত।
এই দৃষ্টান্তের কথা চিন্তা করেই খোঁজলাম সিলেটের পুলিশের কার্যক্রমের তথ্য। তথ্য খোঁজার এ নেশায় যোগ হলো একের পর এক মানবিক গল্প। সিলেট মহানগর পুলিশের অনেক সদস্য নিজের বেতনের টাকা, সরকার থেকে প্রাপ্ত রেশনটুকুও তুলে দিচ্ছেন অসহায় মানুষের হাতে। কোনো কোনো স্থানে রাতের অন্ধকারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেওয়া হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী। মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিদিন ৬শ অসহায় পরিবারকে নিজ উদ্যোগে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে। খাদ্যসামগ্রী প্রাপ্তির তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে না, তৃতীয় লিঙ্গের পরিবার, এমনকি বেধে সম্প্রদায়ও। মোগলাবাজার থানাপুলিশ গত এক সপ্তাহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে রাতের অন্ধকারে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটানো মানুষকে দিচ্ছে খাদ্যসামগ্রী। দক্ষিণ সুরমা থানাপুলিশও-এর বাইরে নয়। শাহপরান, এয়ারপোর্ট, জালালাবাদ থানাপুলিশও অসহায়দের পাশে। কোতোয়ালি থানা মহাগরের প্রাণকেন্দ্রে থাকায় তাদেরতো দায়িত্বটা আরো অনেক বেশি। তারা অসহায়দের খবর নেওয়ার পাশাপাশি মানুষকে করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচাতে জনসমাগম এড়াতে দিনরাত নির্ঘুম কাজ করছে। অসহায়দের সহায়তা দিতে রাস্তায় নামছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া নিজেও।

গত পরশু ফেইসবুকের একটি পোস্ট দেখলাম সফি নামের এক পুলিশ সদস্য নিজের রেশনের খাবারটুকু নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন এক অসহায় পরিবারের কাছে। সফির মতো অনেক পুলিশ সদস্য গোপনে আর নিরবে কাজ করছে মানুষের জন্য। সিলেটের পুলিশ মানবিকতার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে বুঝিয়ে দিয়েছে পেশার ঊর্ধ্বে মানুষ মানুষের জন্য।
আসলেই এখন গর্ব করে বলতে ইচ্ছে করছে-সিলেটের পুলিশ বড্ড খারাপ! খারাপ না হলে কি এই দুঃসময়ে তারা তিন বেলা না খেয়ে দুই বেলা খেতেন? আর এক বেলার খাবারের টাকা সঞ্চয় করে আসহায়দের পাশে দাঁড়াতেন? পুলিশ যদি খারাপ হয় এই সকল খারাপ পুলিশদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা এবং হাজারো স্যালুট।(লেখক : সিলেট প্রতিনিধি : দৈনিক আমাদের সময়।)