বি৭১নি ডেস্ক ::
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, স্বাধীনতার অর্ধশত বছর অতিক্রম জাতীয় জীবনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক। আমাদের জন্য এই সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব আরও বর্ণময় হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে সরকার পরিচালনা করছে।
সব নেতিবাচক এবং নিরাশাবাচক ভবিষ্যদ্বাণী অসার প্রমাণ করে বিশ্বের বুকে গর্বিত দেশ হিসাবে বাংলাদেশ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
এক দশক আগেও যে দেশকে দারিদ্র্য আর অনুন্নয়নের উদাহরণ হিসাবে উপস্থাপন করা হতো, এখন সেই দেশকেই দারিদ্র্য-জয় এবং উন্নয়নের আদর্শ মডেল হিসাবে তুলে ধরছেন বিশেষজ্ঞরা।
মহান স্বাধীনতা দিবস ২০২১ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, গত ১২ বছর আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে আর্থসামাজিক সূচকে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।
আজকের এই উত্তরণের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না। দেশের ভেতরে-বাইরে স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে নানা অপতৎপরতা চালিয়েছে। সে প্রক্রিয়া এখনো অব্যাহত আছে।
কাজেই আমাদের সবাইকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশবিরোধী সব অপতৎপরতা রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই অর্জন দেশের সাধারণ মানুষের।
কৃষক-শ্রমিক-পেশাজীবী, প্রবাসী ও উদ্যোক্তারা শ্রম, মেধা এবং উদ্বাবনী শক্তি দিয়ে দারিদ্র্য নিরসনের অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন। সরকার শুধু নীতিসহায়তা দিয়ে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করেছে।
আপনারা প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের মানুষ অনুকূল পরিবেশ পেলে যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে। গড় আয়ু, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, নারীশিক্ষা, নারীর রাজনৈতিক অধিকার, নারী ও শিশুমৃত্যুর হার, স্যানিটেশন, খাদ্য প্রাপ্যতা-নানা সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে গেছে।
অনেক ক্ষেত্রে অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, সুবর্ণজয়ন্তীর এই শুভক্ষণে আমাদের শপথ নিতে হবে, কেউ যেন মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে।
দেশের গণতান্ত্রিক এবং উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে না পারে। আসুন, ভেদাভেদ ভুলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের উন্নত-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তুলি।
এর আগে বক্তব্যের শুরুতে সবাইকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, এবার আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছি। একইসঙ্গে উদ্যাপিত হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী।
এজন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করছি সেইসব বন্ধুরাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিকে, যারা আমাদের চরম দুঃসময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পাকিস্তানি শাসকরা ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে নিপীড়ন-নির্যাতনের আশ্রয় নেয়।
তখনই অসহযোগ আন্দোলনের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে ঘোষণা করেন : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’
এ সময় ২৫ মার্চ কালরাতে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালানো গণহত্যার কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।
তিনি আরও বলেন, জাতির পিতা পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে বন্দি হওয়ার পূর্বমুহূর্তে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। গোটা জাতিকে প্রতিরোধযুদ্ধ ও মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার নির্দেশ দেন।
তার ঘোষণা তৎকালীন ইপিআর-এর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানি জান্তারা বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করে। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, বীর বাঙালি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে শত্রুমুক্ত করে।
১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। এ সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহিদ এবং দুই লাখ নির্যাতিত মা-বোনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা ২৪ বছরের নিরন্তর রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল। আর এই সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু।
১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সৃষ্ট আন্দোলনে স্বাধিকারের বীজ বপন করেছিলেন। তাকেই সযত্নে লালন-পালন করে স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পরিণত মহিরুহে রূপান্তরিত করেন শেখ মুজিব।
পরিণত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবে। তিনি বলেন, শেখ মুজিব নামের সেই মহাপুরুষের জন্ম হয়েছিল বলেই আজ আমরা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গর্বিত নাগরিক। তার জন্ম হয়েছিল বলেই আজ আমরা নিজস্ব দেশ, ভাষা-সংস্কৃতি নিয়ে গর্ববোধ করি।
শেখ মুজিব একটি দেশ, একটি জাতি-রাষ্ট্রের স্রষ্টা। এ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রেখে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের সুযোগ দেওয়ায় জনগণকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু শুধু স্বপ্ন দেখতেন না। কী করে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়, তিনি তা জানতেন। স্বাধীনতার পর একেবারে শূন্য হাতে মাত্র সাড়ে তিন বছরে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, রেললাইন, পোর্ট সচল করে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করেন।
১২৬টি দেশের স্বীকৃতি ও ২৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে তিনি স্বল্পোন্নত দেশের কাতারভুক্ত করেন।
তিনি বলেন, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রী মহল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে।
তাকে হত্যার মধ্যদিয়ে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে যেমন স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেও ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ১৯৭৫-পরবর্তী অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী অগণতান্ত্রিক শাসকরা বাংলাদেশকে আদর্শচ্যুত করেছে।
দীর্ঘ একুশ বছর দেশের মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে তাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে। বাংলাদেশকে ভিক্ষুকের দেশ হিসাবে বহির্বিশ্বে পরিচিত করেছে।
এ সময় ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে কয়েকটি সূচকের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ বছরে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার।
বর্তমানে যা ২০৬৪ ডলার হয়েছে। ওই সময়ে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। জিডিপির আকার চার লাখ ৮২ হাজার ৩৩৭ কোটি থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা হয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল মাত্র ০ দশমিক ৭৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বিলিয়ন ডলারের কম ছিল, যা বর্তমানে ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। ২০০৫-০৬ বছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান অর্থবছরে আমাদের বাজেটের আকার পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। মানুষের গড় আয়ু ২০০৫-০৬ বছরের ৫৯ বছর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯-২০ সালে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৬ বছর।
শিশুমৃত্যুর হার কমে প্রতি হাজারে ৮৪ থেকে ২৮ এবং মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৩৭০ থেকে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ওই সময় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৭৩ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছর বরাদ্দ ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। দানাদার শস্যের উৎপাদন ২০০৫-০৬ বছরের এক কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে চার কোটি ৫৩ লাখ ৪৪ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চার হাজার ৯০০ মেগাওয়াট থেকে ২৪ হাজার ৪২১ মেগাওয়াটে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ৪৭ থেকে ৯৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা এই প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জন করেছি। প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে ছাত্রছাত্রী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছেড়ে, শ্রমিক কারখানা ছেড়ে, কৃষক লাঙল ফেলে, কামার, কুমার, জেলে তাদের কাজ ফেলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে প্রতিরোধ সংগ্রামে শামিল হয়েছিলেন। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সবাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
তিনি আরও বলেন, একবার ভাবুন তো! আজ যে স্বাধীন দেশের মাটিতে মুক্ত নিঃশ্বাস ফেলছি, তা অর্জনে কতশত তরুণ অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন? কত মা তাদের সন্তান হারিয়েছেন?
কত বাবা তাদের পুত্র হারিয়েছেন? কত বোন তাদের ভাই হারিয়েছেন? কত স্ত্রী তাদের স্বামী হারিয়েছেন? সন্তানরা বাবা হারিয়েছেন? কতশত মুক্তিযোদ্ধা পঙ্গু হয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন?
শেখ হাসিনা আরও বলেন, তাদের একটাই প্রত্যাশা ছিল-এই দেশ স্বাধীন হবে। দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। সবাই মৌলিক অধিকার ভোগ করবে।
আজ আমরা তাদের সেই প্রত্যাশা কিছুটা হলেও পূরণ করতে পেরেছি। আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করছি। তবে এই উদ্যাপন যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব না হয়।
জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে সামনে রেখে আমাদের দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার নতুন করে শপথ নিতে হবে।
এবারের স্বাধীনতা দিবস অন্যান্য বছরের স্বাধীনতা দিবসের মতো নয় বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। বক্তব্যের শেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঙ্ক্তি উচ্চারণ করে সবাইকে আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আনন্দধ্বনি জাগাও গগনে। কে আছ জাগিয়া পুরবে চাহিয়া, বলে ‘উঠ উঠ’ সঘনে গভীর নিদ্রামগনে। হেরো তিমির রজনী যায় ওই, হাসে ঊষা নব জোতির্ময়ী- নব আনন্দে, নব জীবনে, ফুল্ল কুসুমে, মধুর পবনে, বিহগ কলকূজনে।’