বি৭১নি ডেস্ক :
ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ গতকাল শুক্রবার সকালে ভারতের ওড়িশায় আঘাত হানার পর তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজ শনিবার সকালে ঝড়টি বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে।
‘ফণী’র প্রভাবে গতকাল দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টির সময় বজ্রাঘাত এবং আজ শনিবার এর আঘাতে ঝড়ো হাওয়ায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। আমাদের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো :
নোয়াখালীতে নিহত ১
নোয়াখালীর উপকূলীয় উপজেলার সূবর্ণচরে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র প্রভাবে শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এ সময় ঘরচাপা পড়ে এক শিশু নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলায় এ ঝড় আঘাত হানে। নিহত ইসমাইল সূবর্ণচরের চর ওয়াপদা ইউনিয়নের চর আমিনুল হক গ্রামের আব্দুর রহমানের ছেলে।
তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। আহতদের সূবর্ণচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেককে আবার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সুবর্ণচর উপজেলার কন্ট্রোলরুমে দায়িত্ব পালনরত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইকবাল হাসান। তিনি জানান, চর ওয়াপদা ইউনিয়নের চর আমিনুল হক গ্রামে ঘরের মধ্যে চাপা পড়ে একজন নিহত এবং চর ওয়াপদা ও চর জব্বর ইউনিয়নে ৩০ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া ফণীর প্রভাবে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে।
ভোলায় নিহত ১
ভোলা সদরে আজ শনিবার সকালে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নে ঘর ভেঙে চাপা পড়ে রানী বেগম (৪৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামাল হোসেন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিহত রানী বেগম ওই এলাকার সামসুল হকের স্ত্রী। এছাড়া শনিবার সকালে লালমোহনের কচুয়াখালী চর থেকে নিকটবর্তী আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে একটি ট্রলার ডুবে গেছে। এতে চার থেকে পাঁচজন আহত হয়েছেন।
কচুয়াখালীর চর থেকে জেলে নাছির উদ্দিন জানান, শনিবার সকালে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মাইনুদ্দিনে ট্রলারটি ডুবে যায়। চার থেকে পাঁচ জন আহত হন।
ভোলা ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) উপপরিচালক সাহাবুদ্দিন মিয়া জানান, শুক্রবার মধ্যরাত থেকে ভোলায় ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ৭০-৮০ কিলোমিটার। এখনও ৭ নম্বর বিপদ সংকেত বহাল রয়েছে।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূরুল আমিন জানান, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ফসল ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মাসুদ আলম সিদ্দিক জানান, আমরা সার্বক্ষণিক খোঁজ নিচ্ছি। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
লক্ষ্মীপুরে নিহত ১
ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র আঘাতে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলগী গ্রামে আনোয়ারা বেগম (৭০) নামে এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন। আজ শনিবার সকালে ঝড়ে নিজ ঘরের কাঠ গায়ের ওপর পড়লে তিনি মারা যান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বাগেরহাটে নিহত ১
বাগেরহাটের রণজিৎপুরে দমকা হাওয়ায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে এক গৃহবধূ মারা গেছেন। তার নাম শাহারুন বেগন (৫০)। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বাড়িতে ধানের কাজ করার সময় এই ঘটনা ঘটে।
নিহতের আত্মীয় যুবলীগ নেতা শেখ আলফাজ জানান, দুপুরে শাহারুন বেগম ঘরের সামনে বসে ধানের কাজ করছিলেন। তখন তার মাথার ওপর গাছের মোটা ডাল ভেঙে পড়লে তিনি গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
খানপুর ইউপি চেয়ারম্যান ফকির ফহম উদ্দীন জানান, দমকা হাওয়ায় হঠাৎ গাছের ডাল ভেঙে পড়ে শাহারুন বেগম মারা যান। ঘটনার খবর পেয়ে তিনিসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ওই বাড়িতে ছুটে যান।
কিশোরগঞ্জে নিহত ৬
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন, ইটনা ও পাকুন্দিয়ায় বজ্রাঘাতে শিশুসহ ছয়জন মারা গেছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার দিকে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বজ্রপাত হয়। এতে ওই ছয়জন মারা যান।
মিঠামইনে ঝড়-বৃষ্টির সময় বাড়ির সামনের হাওর থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে সুমন মিয়া নামে সাত বছরের শিশু নিহত হয়। এ সময় গরুটি মারা যায়। উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের বিরামচর গ্রামের সামনের হাওরে বোরো ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে মারা যান মো. মহিউদ্দিন (২২)। ইটনায় ধান কাটার কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রাঘাতে রুবেল দাস (২৬) নামে এক যুবক মারা যান।
স্থানীয়রা জানান, ধান কেটে বাড়ি ফিরছিলেন রুবেল। পথিমধ্যে বজ্রাঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলায় গরুর ঘাস কাটতে গিয়ে আসাদ মিয়া (৪৫) নামে এক কৃষক নিহত হয়েছেন। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের কোষাকান্দা গ্রামে বজ্রাঘাতে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। চর ফরহাদি ইউনিয়নের চর আলগীর মৃত হালিম উদ্দিনের মেয়ে নূরুন নাহার ও ইন্নস আলীর ছেলে মজিবুর রহমান (১৭) মারা যান। তারা পথচারী ছিলেন। গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, দুপুরে বাড়ির সামনের জমিতে ঘাস কাটছিলেন আসাদ মিয়া। তখন ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বজ্রপাত হয়। পাকুন্দিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ ইলিয়াস এ তথ্য জানিয়েছেন।
নেত্রকোনায় নিহত ১
নেত্রকোনার মদন উপজেলার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে আবদুল বারেক (৩৫) নামে এক কৃষক মারা গেছেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রমিজুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী ইউনিয়নের মনিকা পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত রুমালীর ছেলে বারেক শুক্রবার দুপুরে বাড়ির সামনের হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রাঘাতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিহত ১
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বজ্রাঘাতে আপেল মিয়া (২০) নামে এক কৃষক নিহত হন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার বগডহর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আপেল মিয়া বগডহর গ্রামের উরমুজ আলী মিয়ার ছেলে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে সকাল থেকে এখানে থেমে থেমে মৃদু হাওয়াসহ বৃষ্টি হচ্ছিল। এরই মধ্যে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বগডহর গ্রামের জমি থেকে ধান কেটে ফেরার সময় আকস্মিক বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই আপেল মিয়া প্রাণ হারান। নবীনগর থানার ওসি রণজিত রায় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
পটুয়াখালীতে নিহত ১
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় তীব্র বাতাসে গাছের ডাল ভেঙে আহত হন মোটরসাইকেল চালক হাবিবুর রহমান (২৫)। ঘটনার পর গতকাল শুক্রবার রাতেই তাকে বরিশাল সেবাচিম হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। হাবিবুর রহমান পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ওরকা পল্লি এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভীর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বরগুনায় নিহত ২
বরগুনার পাথরঘাটার উপকূলীয় এলাকায় গতকাল শুক্রবার রাতে ঝড়ে গাছচাপা পড়ে দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতের প্রত্যেকের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার রামচন্দ্র দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, বরিশালে ফণীর বিপদ প্রায়ই কেটে গেছে এবং ক্রমেই আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিহত ১
ঘূর্ণীঝড় ফণীর প্রভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকে শনিবার বেলা ১২টা পর্যন্ত বৃষ্টির সঙ্গে ছিল ঝড়ো হাওয়া। জেলা সদর, শিবগঞ্জ, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলায় কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর না পাওয়া গেলেও গোমস্তাপুরে বাড়ির পাশের ডোবায় জমা বৃষ্টির পানিতে এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
জানা যায়, গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের কালুপুর গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে মোরসালিন (৪) আজ শনিবার সকালে বাড়ির বাইরে যেয়ে ফিরে না আসায় খোঁজার পর একপর্যায়ে ডোবার পানি থেকে দুপুরে পরিবারের সদস্যরা তার লাশ উদ্ধার করে।
এদিকে, গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিহাব রায়হান শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।