আবু সিনা ছাত্রাবাস রক্ষায় প্রতিবাদী অবস্থানে বক্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক :
সিলেট বাংলাদেশের একটি প্রাচীন শহর। শত শত বছরের পুরনো অনেক নিদর্শন আছে। যা শহরের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী। এ অবস্থায় রাজনৈতিক ফায়দা লোভীর হাতে সিলেটের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিপন্ন হওয়ার পথে। অব্যাহত নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
এমন মতামত সিলেটের প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তি ও পেশাজীবীসহ স্থপতিদের। সোমবার বিকেলে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সিলেটের ঐতিহ্য সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক সমাজ আয়োজিত ‘প্রতিবাদী অবস্থান’ থেকে বক্তারা এ কথা বলেছেন।
অবস্থান কর্মসূচি থেকে সিলেটের আবু সিনা ছাত্রাবাস রক্ষাসহ সিলেট নগর, বিভাগের চার জেলার শত বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষায় যুগপৎ সামাজিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়। সিলেট নগরকে যানজটমুক্ত রাখতে কেন্দ্রস্থর এলাকায় বহুতল বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল নির্মাণকে ‘এথিক সেন্স’ বিহীন কাণ্ড’ অভিহিত করে নির্মাণাধীন জেলা হাসপাতাল সিলেট নগরের ‘রোগীবান্ধব’ যে কোনো এলাকায় স্থানান্তর করার দাবি জানানো হয়।
বিকেল চারটা থেকে একটানা আড়াই ঘণ্টা চলা প্রতিবাদী অবস্থানে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা একাত্ম হন। পাশাপাশি সিলেটের প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ পেশাজীবীরা সংহতি জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সিলেটের ঐতিহ্য সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক সমাজ মুখপাত্র মোস্তাফা শাহজামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচির শুরুতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম। এরপর প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বক্তব্য দেন, সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম। বক্তৃতায় তিনি সিলেটের সকল ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রাজনৈতিক ফায়দা লোভীদের হাতে বিপন্ন হতে চলেছে উল্লেখ করে বলেন, ‘আবু সিনা ছাত্রাবাসে একটি নাম ফলক পাওয়া গেছে। সেটি ১৮৫০ সালের। এই ১৮৫০ সাল যদি আমরা ধরি, তাহলে ভবনটি পৌনে দুই শত বছরের পুরনো। এত পুরনো একটি ভবন নিঃসন্দেহে একটি প্রাচীন নিদর্শন। অথচ কোনো কিছু না বলে এটি ভেঙে হাসপাতাল নির্মাণ শুরু করা হয়। সারা পৃথিবীজুড়ে যেখানে পুরনো ইতিহাস-ঐতিহ্য-নিদর্শন সংরক্ষণে যেখানে সরকার উদ্যোগী, সেখানে আমাদের সরকারকে ভুল বুঝিয়ে ঐতিহ্য ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। এটা আরেক ষড়যন্ত্র।’
শতবর্ষী ভবন ভেঙে হাসপাতাল না হলে প্রকল্পের টাকা ফেরত যাবে বলে ভয় দেখানো হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘জনগণের টাকা নিয়ে জনগণকে ভয় দেখানো হচ্ছে। এই টাকার মালিক কোনো মন্ত্রী না, জনগণ। আর মন্ত্রী হচ্ছেন জনগণের টাকার পাহারাদার। তাই জনগণের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় করতে হবে অবশ্যই নাগরিকদের মতামত নিতে হবে। নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতিরা যেখানে বলছেন, শতবর্ষী ভবন সুরক্ষা প্রয়োজন, সেখানে নাগরিক সমাজ এককাট্টা এই দাবিতে।’
নাগরিক সমাজের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে এ বক্তব্যের পর প্রতিবাদী অবস্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে সংহতি জানিয়ে পর্যায়ক্রমে বক্তব্য শুরু হয়।
গণজাগরণ মঞ্চ সিলেটের মুখপাত্র দেবাশীষ দেবুর সঞ্চালনায় সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন, মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান বীর উত্তম, কর্নেল (অব.) মো. আবদুস সালাম বীরপ্রতীক, সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাস্তবায়ন কমিটির সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা সদরউদ্দিন আহমদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সিলেটের সাবেক কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী, জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক জাকির আহমদ, সাম্যবাদী দলের সভাপতি ধীরেন সিংহ, ওয়াকার্স পার্টির কেন্দ্রীয় পলিট ব্যুরোর সদস্য সিকান্দর আলী, বাসদের সমন্বয়ক আবু জাফর, প্রণব জ্যোতি পাল, বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সদস্য এডভোকেট হুমায়ুন রশীদ সুয়েব, সিপিবি’র যুগ্ম সম্পাদক খায়রুল হাসান, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য মোকাদ্দেস বাবুল, উদীচী, সিলেটের সভাপতি এনায়েত হোসেন মানিক, চারুশিল্পী সমন্বয় পরিষদের পক্ষে শামসুল বাসিত শেরো, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান ও সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের স্থপতি শুভজিৎ চৌধুরী, লিডিং ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক রাজন দাশ, নাগরিক মৈত্রী সিলেটের সমন্বয়ক সমর বিজয় সী শেখর, সেভ দ্যা হেরিটেজ সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হাই আল হাদী, সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশু, সহসভাপতি উজ্জ্বল দাশ, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সরকার সুহেল রানা, সাংস্কৃতিক সংগঠন নগরনাট সভাপতি উজ্জ্বল চক্রবর্তীসহ ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়নসহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
সিলেটের কেন্দ্রস্থলের চৌহাট্টা এলাকায় শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের (সদর হাসপাতাল) পাশে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের আবু সিনা ছাত্রাবাস। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৮৫০ সালে নির্মিত হয়েছিল ভবনটি। পুরাকীর্তি হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব তালিকায় স্থান পাওয়ার যোগ্য ভবনটি সংরক্ষণ না করে পুরোটা ভেঙে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অর্থায়নে আট তলা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল নির্মাণ সম্প্রতি শুরু করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। বাংলাদেশ পুরাকীর্তি আইন ১৯৬৮ অনুযায়ী শতবর্ষী কোনো স্থাপনা ভাঙা বেআইনি হওয়ায় সংরক্ষণের দাবিতে সোচ্চার হন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পে ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল নির্মাণকাজ গত মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৮৭ কোটি টাকা। হাসপাতাল স্থানান্তর হলে প্রকল্পের টাকা ফেরত চলে যাবে-এমন আশঙ্কা স্থানীয় সাংসদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন প্রকাশ করলে আবু সিনা ছাত্রাবাস এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণ, পুরনো স্থাপনার কিছু অংশ রক্ষা-এ রকম দাবি নিয়ে দুটো পক্ষের সৃষ্টি হয়।এরমধ্যে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রক্ষায় অবিচল থাকা নাগরিক সমাজের পক্ষে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদী নানা কর্মসূচি পালন করে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল ‘প্রতিবাদী অবস্থান’ কর্মসূচি পালন হয়।
‘প্রতিবাদী আর্ট ক্যাম্প’ ৪ মে
শতবর্ষী ভবন ভাঙা ঠেকাতে নাগরিক সমাজের আহবানের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে গত প্রায় দেড় মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন হয়েছে। প্রতিবাদী মানববন্ধন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, ছায়া সংসদ বিতর্ক ও গতকাল প্রতিবাদী অবস্থান শেষে আগামী ৪ মে চারুকলার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে ‘প্রতিবাদী আর্ট ক্যাম্প’ হবে। গতকাল প্রতিবাদী অবস্থান শেষে এ কর্মসূচি ঘোষণার পাশাপাশি সিলেট নগর, বিভাগের চার জেলায় শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় যুগপৎ সামাজিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে মাসব্যাপী বিশেষ অনুসন্ধান তৎপরতা সিলেটের ঐতিহ্য সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক সমাজের মাধ্যমে চলানোর বিষয়টি জানানো হয়।