• ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

অভিযুক্তদের নিয়েই হাওরের বাঁধ নির্মাণ কমিটি, কাজে ধীরগতি

bijoy71news
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৪, ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক :                                                   ফাইল ছবি
২০১৭ সালে অকাল বন্যায় হাওরের ব্যাপক ফসলহানির পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ এনে আদালতে মামলা করেছিলো সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতি। সেই মামলার আসামী ছিলেন শাল্লা উপজেলার হাবিবপুর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামের শিথিল চন্দ্র। অথচ এবারের বাঁধ নির্মাণের কমিটিতেও রয়েছেন শিথিল। বাঁধ নির্মাণে গঠিত ৪০ নম্বর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)-এর সভাপতি করা হয়েছে শিথিল চন্দ্র দাসকে।
ওই মামলারই আসামী ছিলেন একই ইউনিয়নের আনন্দরপুর গ্রামের সুব্রত সরকার, আটগাও ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের আবুল মিয়া ও উজান ইয়ারাবাদ গ্রামের বশির মিয়া। এই তিনজকেও এবার তিনটি পিইসির সভাপতি করা হয়েছে।
আইনজীবী সমিতির এ মামলার আসামী দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামের লাল মিয়া, চরনাচর ইউনিয়নের প্রদীপ ভৌমিক, জগদল ইউনিয়নের কালিয়াকাপন গ্রামের মিজানুর রহমান চৌধুরী এবং ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের আব্দুল আউয়ালও রয়েছেন বাঁধ নির্মাণের কমিটিতে।
এবার সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষায় গঠিত কমিটিতে রয়েছেন দুই বছর আগে বাঁধ নির্মান কাজে দুর্নীতি মামমলার বেশকয়েকজন আসামী। এতে করে ভালোভাবে বাঁধ নির্মান নিয়ে শঙ্কা রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
শঙ্কা রয়েছে নির্ধারিত সময়ে বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া নিয়েও। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার কথা। যা শেষ হবে ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইতোমধ্যে সময়সীমার দেড় মাস পেরিয়ে গেছে। তবে এই সময়ের মধ্যে জেলা প্রশাসন ও পাউবো’র হিসেবেই- কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশ। হাতে আছে মাত্র একমাস। এই সময়ে বাকী কাজ শেষ হওয়া নিয়ে তাই শঙ্কিত হাওরের কৃষকরা।
বাঁধ নির্মানের সম্পৃক্ত পিইসি’র সদস্যরা জানিয়েছেন, পিইসি গঠনে বিলম্বের কারণে বাঁধ নির্মাণ কাজ দেরীতে শুরু হয়েছে। এছাড়া মাটির কাটার মেশিন (এসকেভেটর) সঙ্কটের কারণে কাজেও আশানুরুপ গতি পাচ্ছে না।
এসব ব্যাপারে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক আব্দুল আহাদ বলেন, এবারের পিইসিতে আগেরবারের কিছু আসামী ঢুকে পড়েছেন। এনিয়ে কয়েকটি অভিযোগও পেয়েছি। ইতোমধ্যে দিরাই উপজেলার তিনজনকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বাকী অভিযোগগুলোর তথ্য যাছাই বাছাই করা হচ্ছে। প্রমাণ পেলে তাদেরও বাদ দিয়ে নতুন করে কমিটি করা হবে। এসব ব্যাপারে কোনো ছাড়া দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বাঁধের কাজ ২৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বাকী কাজ শেষ হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থ বছরে কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির মাধ্যমে ৫৫৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)-এর মাধ্যমে জেলার ছোটবড়ো ৩৭টি হাওড়ে ৪৫০ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদরে ৩ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার, বিশ্বম্ভরপুরে ১৫ দশমিক ২৩ কিলোমিটার, তাহিরপুরে ৫৫ দশমিক.৪৩ কিলোমিটার, ধর্মপাশায় ৫৫ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার, জামালগঞ্জে ৬১ দশমিক ৮০ কিলোমিটার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ৩৬ দশমিক ২০ কিলোমিটার, জগন্নাথপুরে ৩১ দশমিক ৮২ কিলোমিটার, ছাতকে ৪ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার, দোয়ারাবাজারে ১০ দশমিক ২২ কিলোমিটার, দিরাইয়ে ৭৪ দশমিক ২৬ কিলোমিটার, শাল্লায় ৯৯ কিলোমিটারসহ বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
বাঁধ নির্মাণ কাজে নীতিমালা অনুযায়ী, বাঁধের নিকটবর্তী জমির মালিক ও সুবিধাভোগীদের নিয়ে কমিটি গঠণ করে বাঁধের কাজ করা হবে। প্রতিটি কমিটি হবে ৫ থেকে ৭ সদস্যের। সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার কাজ করতে পারবে একটি পিআইসি। তবে এবারের কমিটিতে আগেরবারের আসামীরা ছাড়াও রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেকে ঠাঁই পেয়েছেন বলে অভিযেগ ওঠেছে।
তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন একটি পিআইসির সভাপতি। তার পরিবারের আরও দুই সদস্য আরও দুটি পিআইসি’র সভাপতি ও সদস্য সচিব হিসেবে আছেন। কেবল আওয়ামী লীগ নয় আছেন বিএনপি নেতারাও। তাহির উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি বোরহান উদ্দিন ও উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দুটি পিইসির সভাপতি। এভাবে দুই দলের অনেকেই রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢুকে পড়েছেন বাঁধ নির্মাণ কমিটিতে।
এ ব্যাপারে তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, আমরা কৃষক পরিবার। হাওড়ে আমাদের প্রচুর জমি রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, কৃষক হিসেবেই আমাদের পরিবারের সদস্যরা কমিটিতে রয়েছেন।
কেবল কমিটি নয়, কাজের গতি নিয়েও ক্ষুব্দ স্থানীয় কৃষকরা। তাহিরপুর উপজেলার আশারকান্দি গ্রামের কৃষক আব্দুল বাসেত বলেন, যেভাবে কাজ চলছে তাতে ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তিনি বলেন, উপরমহল থেকে চাপ আসলে শেষের দিকে দেখা যেতে পারে তাড়াহুড়ো করে কোনোরকমে বাঁধের উপরে কিছু মাটি ফেলে দেওয়া যাবে। যা একটি বৃষ্টিতেই ধুঁয়ে যাবে। এমনটি হলে এই কাজ কৃষকদের কোনো কাজে আসবে না।
তবে কাজের সাথে সম্পৃক্তরা বলছেন, এসকেভেটর ও মাটি সঙ্কটের কারণে বাঁধ নির্মাণ কাজে গতি পাচ্ছে না।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের সাতগাঁও গ্রামের বাচ্চু মিয়া বলেন, গতবছরের চেয়ে এবছর এস্কেভেটর মেশিনের সংকট বেশি। সব হাওড়ে একসঙ্গে বাঁধের কাজ শুরু হওয়ায় পিআইসির লোকজন পর্যাপ্ত পরিমাণ এস্কেভেটর মেশিন পাচ্ছেন না। তাই ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ ঢিমেতালে চলছে।
জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অসীম চন্দ্র তালুকদার বলেন, এবছর হাওরের বাঁধ নির্মাণে মাটি সংকট রয়েছে। এছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে এস্কেভেটর আনতে ৩/ ৪ লাখ টাকা অগ্রিম দিতে হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির লোকজন সহজে এস্কেভেটর হাওড়ে আনতে পারছেন না। তাই গতবছরের তুলনায় এবছর বাঁধ নির্মাণে অনেকটা ধীরগতি রয়েছে।
এসব ব্যাপারে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভুইয়া বলেন, এবার হাওড়ে দুইশটি এক্সেভেটর দিয়ে বাঁধের মাটি কাটার কাজ চলছে। গতবছর এক্সেভেটর ছিলো ২৫০টি। তারপরও এটি তেমন সমস্যা হবে না বলে জানান এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, জামালগঞ্জের ভোগালখালি হাওড়ের দুটি বাঁধ ছাড়া সবগুলো বাঁধের কাজই ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্ধারিতে সময়ে কাজ শেষ করতে সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবছর এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৬১৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে অকাল বন্যায় হাওড়ের ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে তলিয়ে যায় বিস্তৃর্ণ বোরো ফসল। সরকারী হিসেবে, ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ১৫৪ হাওড়ের ২ লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১ লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমির ফসল। তবে কৃষকদের হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ ছিলো প্রায় দ্বিগুণ।
সে বছর ফসলহানির পর পর বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগি ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ওইবছরের ২ জুলাই পাউবো’১৫ প্রকৌশলী ও ৪৬ জন ঠিকাদারসহ ৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। একবছরের ৩ আগস্ট সুনাগঞ্জের বিশেষ আদালতে জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে দুর্নীতির অভিযোগে আরেকটি মামলা করা হয়।