• ৬ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৩শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ১৮ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

৪৭ বছরেও স্বীকৃতি পায়নি বিশ্বনাথের শহীদ মোবাশ্বির আলীর পরিবার

bijoy71news
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১৫, ২০১৮

সিলেট :
মোবাশ্বির আলী। দেশের টানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। মোবাশ্বির আলী তখন ইপিআরে চাকুরি করতেন। চাকরির সুবাধে তিনি বি-বাড়িয়া জেলার আখাউড়া থানার গঙ্গা সাগর এলাকায় ধনরাজপুর (ধনারচর) গ্রামের ডাক্তার সেলিম মিয়ার বাড়িতে অবস্থান নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন।
একই এলাকার গঙ্গা সাগরের পুর্ব প্রান্তে তৎকালিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত মোস্তফা কামাল বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি পেলেও পশ্চিম প্রান্তে তুমুল লড়াই করে যিনি শহীদ হয়েছিলেন সেই মোবাশ্বির আলী এখনো মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি টুকু পাননি।
তবে তার স্ত্রী-সন্তানরা বলছেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে, এটাই তাদের বড় পাওয়া। তারপরও একটা আক্ষেপ রয়ে গেছে তাদের। দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যিনি যুদ্ধ করেছেন, অথচ এখনো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হয়নি এমন শতশত প্রশ্ন শহীদ মোবাশ্বির আলীর স্বজনদের।
তারা জানান, শহীদ গেজেটে মোবাশ্বির আলী’র ক্রমিক নং ৪৯৩, শহীদ নং ১১০১১ পদবী সিপাহী উল্লেখ থাকলেও তারা সরকারী কোন সুযোগ-সুবিধা এখনও পাননি।
শহীদ মোবাশ্বির আলী সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার ৩নং অলংকারী ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের তাকরেছ আলীর পুত্র ও সাবেক তিন বারের ইউপি চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুর রবের ভাতিজা ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুর রহমানের চাচাতো ভাই।
শহীদ মোবাশ্বির আলীর রেখে যাওয়া সহায় সম্বল সব টুকু বিক্রি করে এতোদিন সংসার চালিয়েছেন তার স্ত্রী। এখন তাঁর নেই মাথা গোজার ঠাই। আশ্রয় নিয়েছেন মেয়ের বাড়িতে।
একাত্তরে ২নং সেক্টর আখাউড়া হেড কোয়ার্টারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন মোবাশ্বির আলী। তার সাথে ছিলেন মোল্লারগাঁও হাজরাইয়ের আনোয়ার হোসেন, বাবুল মিয়া সহ অনেকে। তবে মোবাশ্বির আলী, আনোয়ার হোসেন ও বাবুল মিয়া তৎকালিন ইপিআরে চাকুরি করতেন। দেশমাতৃকার টানে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তারা। যুদ্ধের পর আনোয়ার হোসেন ও বাবুল মিয়া ফিরে এলেও এখনো খুঁজ পাওয়া যায়নি শহীদ মোবাশ্বিরের।
মুক্তিযুদ্ধে জীবন ফিরে পাওয়া সহযোদ্ধা বাবুল মিয়া জানান, তিনি যখন যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে ভারতের আগরতলায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, তখন মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন বাবুল মিয়া কে বলেছিলেন মোবাশ্বির আলী শহীদ হয়েছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোবাশ্বির আলীর লাশ কোথায় কিভাবে দাফন করা হয়েছে বাবুল মিয়া আর কিছু বলতে পারেননি।
বাবুল মিয়া এখনো জীবিত আছেন। তিনি মাঝে মধ্যে শহীদ মোবাশ্বিরের স্ত্রী-সন্তানদের খুঁজ-খবর নেন জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সুযোগ সুবিধা প্রদান করলেও শহীদ এই পরিবারটি সকল সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এই পরিবারের স্বীকৃতি প্রদানের দাবী জানান।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একই এলাকায় যুদ্ধ করে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম খেতাব পেলেন মোস্তফা কামাল। অতচ মোবাশ্বিরের পরিবার আজো মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতি পায়নি। এটা দেশের জন্য দুঃখজনক ।
যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবুল মিয়া বলেন, গঙ্গা সাগরের পশ্চিম প্রান্তে যুদ্ধের সময় সেখানে বাংঙ্কার খনন করেন মোবাশ্বির আলী সহ অন্য মুক্তিযোদ্ধারা। এসময় পাশের সড়কের দুইটি রেলওয়ে ব্রীজ গুড়িয়ে দেই। এসব কাজে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন মোবাশ্বির আলী। পাকহানাদার বাহীনি ব্রীজ বিচ্ছিন্ন দেখলেই বুঝতে পারতো এখানে মুক্তি বাহিনীর অবস্থান আছে, মুক্তি বাহিনী আর পাকহানাদার বাহিনীর মধ্যে তুমুল যুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের হাত বোমার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েয়ে যায়। এসময় বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবুল মিয়াও গুলিবিদ্ধ হন। একই সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোবাশ্বির আলী আর্টিলারি বোমার আঘাতে বাংঙ্কারেই শহীদ হন।
মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোবাশ্বির আলীর স্মৃতি রক্ষায় স্থানিয় যুবক ও প্রবাসী যুবকদের সমন্ময়ে গড়ে তোলা হয়েছে শহীদ মোবাশ্বির আলী স্মৃতি পরিষদ। এই সংগঠনের অর্থায়নে উপজেলার ৩নং অলংকারী ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের রাস্তার পাশে একটি নামফলক নির্মান করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোবাশ্বির আলীর এই নামফলক স্থানিয় শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করছে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মোবাশ্বির আলীর স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সদস্যরা। সেই সাথে কামাল বাজার খাজাঞ্চি সড়কের নাম শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা মোবাশ্বির আলীর নামে নামকরন করার দাবি জানান তারা।