• ৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৫শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ২০শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

যথাসময়ে কাজ শেষ করার তাগিদ থাকলেও অগ্রগতি আসেনি

bijoy71news
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২১
যথাসময়ে কাজ শেষ করার তাগিদ থাকলেও অগ্রগতি আসেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক ::

৯ বছরে কাজ হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ! ২০১১ সালে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল পথটি পুণরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। সকল প্রক্রিয়া শেষে আড়াই বছর আগে ‌’কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল সেকশন পুনর্বাসন প্রকল্পের’ কাজ শুরু হয়। এরপর একাধিকবার প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি করে সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হয়।
তবে এই সময়কালে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩০ শতাংশ। কাজ বাকি এখনো ৭০ শতাংশ। যথাসময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তাগিদ থাকলেও এ প্রকল্পে কোন অগ্রগতি আসেনি। কাজের ধীরগতিতে প্রকল্পের ব্যায় বৃদ্ধির আশংকা দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পে প্রথমে বাংলাদেশ সরাকারের অর্থায়ন ও পরে ভারতের অর্থায়নের সিদ্ধান্ত এছাড়াও রেলপথটি প্রথমে মিটার গেজ এবং পরে ডুয়েল গেজে রূপান্তর, পরামর্শক নিয়োগ, ডিজাইন, টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ, ঋণ চুক্তি ও ঋণ ছাড়পত্রের কাজ সম্পাদনসহ নানা জটিলতায় বিলম্ব হয়। এখন প্রকল্পের কাজে অবৈধ উচ্ছেদ, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাজের ধীরগতি, রেললাইনের ওপর বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণ না করায় ও করোনার লকাডাউনে কাজ প্রায় ৪ মাস বন্ধ থাকাসহ নানা প্রতিবন্ধিকতায় প্রকল্পের কাজ আগামী ২ বছরেও শেষ হবে কি না এ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
তথ্যমতে, ২০০২ সালে বিএনপির সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া এ রেলপথটি প্রথম ২০১১ সালে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১৫ সালে ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটির আওতায় কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনে পুনর্বাসন প্রকল্প সংশোধিত করে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। এরপর ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৬৭৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১২২ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণ থেকে ৫৫৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
২০১৮ সালের মে মাসে শুরু হওয়া কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের মে মাসে সম্মপন্ন হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় আরো ছয় মাস কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়।
এ প্রকল্পটি নিয়ে গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভা প্রসঙ্গে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় জুন ২০২০ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত মোট ব্যয় হয়েছে ১শ ১২ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে সরকারের তহবিলের ১২ কোটি ৬৫ লক্ষ টাকা এবং ঋণ থেকে ৯৯ কোটি৭৮ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এ প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ৬১ কোটি টাকা। এর মধ্যে দুই মাসে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৯ কোটি টাকা।
সম্প্রতি কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলওয়ে পুনর্বাসন প্রকল্প সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পুরোনো রেল লাইন অপসারণ করে এক্সেভেটর দিয়ে রেলপথটি মাটি ভড়াট করে উচু ও প্রসস্থকরণের কাজ করা হচ্ছে। রেল ব্রিজ ভেঙ্গে সেগুলো পুননির্মাণ কাজ চলছে। জুড়ী অংশে দখলকৃত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করছে রেল কর্তৃপক্ষ। শাহবাজপুর, বড়লেখা, মুড়াউল, দক্ষিণভাগ স্টেশনের পুরাতন ভবন ও প্লাটফর্মসহ সকল স্থাপনা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। তবে নতুন ভবন, প্লাটফর্ম ও স্থাপনের কাজ এখনো শুরু হয়নি। রেল লাইনের পাশে থাকা গাছ কেটে সরিয়ে ফেলা হয়েছে আগেই। তবে রেললাইনের পাশে থাকা বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুতের ৩৩ হাজার কেভি ভোল্টের বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনের খুঁটি অপসারণ না করায় প্রকল্পের কাজে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কালিন্দি রেলনির্মাণের ব্যবস্থাপক (সিভিল) আশরাফুল ইসলামকে কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকাবস্থায় পাওয়া গেলে কাজের অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করতে চান নি।
তিনি জানান, কিছুদিন হলো তিনি দায়িত্ব পেয়েছেন। কাজের অগ্রগতিসসহ সার্বিক বিষয় প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা ভালো বলতে পারবেন।
তিনি বলেন, আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কাজ শেষ হতে আরো বছর দুয়েক সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্র জানায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৯৬ সালের ৪ ডিসেম্বর চালু হয় কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথটি। এটি ভারতের আসাম রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলো। এরপর কুলাউড়া-শাহবাজপুর পর্যন্ত লাতুর ট্রেন নামে একটি ট্রেন চলাচল করতো। তবে বাজেট স্বল্পতার কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এক সময় ট্রেন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে রেলপথটি। ঘন ঘন রেল দুর্ঘটনা ও রেলপথটি চলাচল অনুপোযোগী কারণ দেখিয়ে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ২০০২ সালের ৭ জুলাই বন্ধ করে দেওয়া হয় দীর্ঘ ১০৬ বছর চালু থাকা এ রেলপথটি।
বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রেলের সম্পত্তি বেদখল হয়ে যায়। সড়কপথে ভাড়া বেশি হওয়ায় এলাকাবাসীর যাতায়াত ও পণ্য পরিবহণ খরচ বেড়ে যায়। জুড়ী, দক্ষিণভাগ, কাঁঠালতলী, বড়লেখা, মুড়াউল ও শাহবাজপুর এ ছয়টি রেল স্টেশন স্থবির হয়ে পড়ে। ট্রেন চালুর দাবিতে বিভিন্ন সময়ে কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখার মানুষ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে সভা-সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচি পালন করেন।
২০১৮ সালে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আনুষ্ঠানিকভাবে ৫২ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার দৈঘ্যের কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশনটির কাজের উদ্বোধন করেন।
প্রকল্পের আওতায় সেকশনটিতে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের মধ্যে মেইন লাইন ৪৪ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার ও লুপ লাইন ৭ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার। নতুন রেল ও পিসি স্লিপার দ্বারা ডুয়েলগেজ সিঙ্গেল লাইনে পুনর্বাসন করা হবে। ৬টি (বি ক্লাস ৪টি ও ডি ক্লাস ২টি) স্টেশন ভবন নির্মাণ ও পুন:নির্মাণ এবং প্লাটফরম নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ করা হবে। ৫৯টি রেল সেতুর এর মধ্যে মেজর ১৭টি ও মাইনর ৪২টি সেতু নির্মাণ ও পুন:নির্মাণ করা হবে। নন-ইন্টারলকড কালার লাইট সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের কাজ তদারকি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কুলাউড়া-শ্রীমঙ্গল এবং সিলেটের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী জুয়েল হোসাইন বলেন, নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে যতটুকু লজিস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন আমরা বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে দিয়ে যাচ্ছি। করোনার লকাডাউনে কয়েকমাস কাজ বন্ধ ছিলো। রেলের জমিতে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, রেল লাইনের ওপর থাকা গাছগুলো অপসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে রেলপথের জায়গার ওপর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনের খুঁটিগুলো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এগুলো অপসারণের জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুতের কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে এগুলো অপসারণের জন্য জানিয়েছি। এখনো পর্যন্ত সেগুলো তারা অপসারণের কোন উদ্যোগ নেয়নি। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ২৮/৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পুরো কাজ শেষ হতে এখনো প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। ধীরগতির ও মেয়াদ বৃদ্ধিতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে কিনা সেটা এখনো জানা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে প্রকল্পের পরিচালক সুলতান আলীর অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।