নিজস্ব প্রতিবেদক ::
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় মুজিববর্ষ উপলক্ষে অসহায় ভূমিহীন ও গৃহহীনদের প্রধানমন্ত্রীর উপহারের গৃহনির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে। শুরুতেই গৃহনির্মাণ প্রকল্পে পিআইও অফিসের দুর্নীতির হোতা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কে এম নজরুল ইসলাম তার পছন্দের লোক সাইফুলের নেতৃত্বে গঠন করেন একটি সিন্ডিকেট। ঘর পাইয়ে দেওয়ার নামে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে উপকারভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে টাকা। ঘর পেয়েও কিনে দিতে হয়েছে গৃহনির্মাণের নানা সরঞ্জাম। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওই সিন্ডিকেটের মুল হোতা সাইফুল। নিম্নমানের জিনিস দিয়ে নির্মাণ করায় নির্মাণাধীন ঘর ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে উপকারভোগীদের মধ্যে।
এসব ঘর দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নবাগত ইউএনও মাহমুদুর রহমান মামুন। দুর্নীতিতে লাগাম টানার আশ্বাস দিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কাজ খুব নিম্নমানের হয়েছে। আমি এগুলো দেখব। এখন থেকে আর কোনো সমস্যা হবে না। আমি নিজে দায়িত্ব নিয়েছি। যথাযথভাবে কাজ সম্পন্ন করা হবে। পিআইও’র দুর্নীতির হোতা সাইফুলকে ইতোমধ্যে এলাকায় না আসতে বলে দিয়েছি।
চরনারচর ভূমি অফিস সূত্রে জনা গেছে, উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পুর্ব শ্যামারচর বড়হাটি সরকারের খাস ভুমিতে পশ্চিম দৌলতপুর মৌজার ৮৫ নম্বর দাগে ১২টি ও ২২ নম্বর দাগে ১৩টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে ২২ নম্বর দাগে হেমেন্ড মাৎস্য দাস, ঝরনা রানী দাস, সঞ্জিত দাস, গোপেন্দ্র দাস, নির্ময় দাস, সমর মাৎস্য দাস ও পিযুষ দাসের ৭টি ভূমিহীন পরিবার ঘর পাওয়ার আশ্বাস পেয়ে তাদের শেষ সম্বল গরু, সোনাদানা বিক্রি করে মাটি কেটে ভিটা তৈরি করেছে এবং ঘরের আশায় খোলা আকাশের নীচে বসবাস করছে।
সরেজমিনে পূর্ব শ্যামারচর গ্রামে গিয়ে উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, শুরু থেকে সারাদিন আমাদেরকে সহযোগী শ্রমিক হিসেবে খাটতে হচ্ছে। নির্মাণ শ্রমিক নাছির ও ইসমাইলসহ তাদের ৮ জনকে খাওয়াতে হচ্ছে। প্রতিটি ঘরের জন্য ৫-৬ হাজার টাকার কাঠ কিনে দিতে হচ্ছে। বর্গা লাগানোর জন্য বাড়তি ৫শ টাকা, ছাউনীর জন্য ৫শ টাকা দিতে হচ্ছে। ৫ হাজার ইটের স্থলে ৪ হাজার বাজে ইট, ভিট বালু দিয়ে আস্তরন করা হয়েছে, ৪৫ বস্তা সিমেন্টের স্থলে ৩০ বস্তা সিমেন্ট দিয়ে নামমাত্র কাজ করা হচ্ছে। এগুলো বলতে গেলে ঘর না করে মালামাল ফেরত নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
নিম্নমানের এসব মালামাল সরবরাহের বিষয়ে জানতে চাইলে উপকারভোগীরা বলেন, পিআইও নজরুল ও সাইফুল এসব মালামাল দিয়েছেন। এসব মালামাল ভালো নয় বললে উল্টো তারা ঘর না দেওয়ার কথা বলে মালামাল ফেরত নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন।
উপকারভোগী বিশ্বজিৎ দাসসহ স্থানীয় একাধিক লোক জানান, পূর্ব শ্যামারচর বড়হাটিতে ১২টি ঘরের দলিল দেওয়া হলেও ঘরের কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। নিম্নমানের প্লাস্টিকের টয়লেট কমোড দিলেও আমরা কেউ তা লাগাইনি। সবাই নিজের টাকা দিয়ে ভালোমানের কমোড লাগিয়েছি। বাথরুমের দরজা লাগানো বাকি। ৮টি বর্গার স্থলে ৪টি বর্গা দেওয়ায় ৬ হাজার টাকার কাঠ কিনতে হয়েছে এবং মজুরী বাবদ অতিরিক্ত ৫শ টাকা দিতে হয়েছে। ৭-৮ জন শ্রমিককে তাদের চাহিদামতো ১ মাস খাওয়াতে হয়েছে। তাদের খাবারের চাহিদার তালিকায় নিয়মিত হাঁস-মুরগী রাখা লাগত। নিম্নমানের ইট, বালু, কাঠ নিয়ে শুরুতেই আমরা প্রতিবাদ করলে পিআইও ও সাইফুল হুমকি দিয়ে বলেন, যে বেশি কথা বলবে তার ঘর হবে না।
দুর্নীতির একই রূপ দেখা গেছে করিমপুর ইউনিয়নের চান্দপুর মৌজার ১০০০ দাগে ১৯টি গৃহনির্মাণের কাজে। অধিকাংশ উপকারভোগীর সঙ্গে পিআইও নজরুল ইসলাম সমঝোতা করে ঘর নির্মাণ করতে গিয়ে সরকারের অনুমোদিত নকশা, আকার-আকৃতি পরিবর্তন করে ঘর নির্মাণ করছেন। উপকারভোগী তিন ভাই গীরেন্দ্র বর্মন, কিতিন্দ্র বর্মন ও কিরণ বর্মন তিনটি ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন। সকলেই ঘরের নকশা পরিবর্তন করে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি নিজেদের লাখ লাখ টাকা যুক্ত করে পছন্দমতো ঘর তৈরি করেছেন। এর মধ্যে স্বর্ণ ব্যবসায়ী দিরাই উপজেলা রোডস্থ সেঁজুতি স্বর্ণ শিল্পালয়ের স্বত্ত্বাধিকারী কিরণ বর্মন অন্তত ৩ লাখ টাকা খরচ করে ঘরের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। একইভাবে ঘরের নকশা পরিবর্তন করে নিজেদের মনমতো ঘর নির্মাণ করছেন রাকেশ বর্মন, মিন্টু বর্মন, মিঠু বর্মন, পিন্টু বর্মন, রতন বর্মন, নিকলেশ বর্মনসহ অনেকেই। এদের মধ্যে কেউ কেউ ২ শতাংশ জমিসহ ঘর বরাদ্দ পেলেও অতিরিক্ত ভূমি দখল করে রেখেছেন। ৫০ শতাংশে ২৫ পরিবারের ঠাঁই হওয়ার কথা থাকলেও অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না।
চান্দপুর গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দরিদ্র জেলে বলেন, দিনমজুরিতে জাল টেনে সংসার চালাই। শুনলাম যাদের কিছু নাই, তাদের শেখ হাসিনা ঘর দিচ্ছেন। কিন্তু আমরা পাইনি। যাদের লাখ লাখ টাকা স্বর্ণ ব্যবসা, মাছের আড়ৎ রয়েছে, তারা ঘর পাচ্ছে।
তহশিলদার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, চান্দপুর মৌজার ১০০০ দাগে ১০ একরের বেশি ভূমি রয়েছে। এর মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি উঁচু জায়গা আছে। তবে আশ্রয়ন প্রকল্পে ১৯টি সুবিধাভোগী পরিবারসহ অনেকে অতিরিক্ত ভূমি দখল করে আছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, শুরুতেই প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ভূমিহীনদের গৃহনির্মাণ প্রকল্পে নয়ছয় শুরু করেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে দুর্নীতির প্রধান সহযোগী হিসেবে জনৈক সাইফুল নামের এক ব্যাক্তিকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেন। সেই সাইফুল নিজেকে কখনও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নিয়োজিত লোক, কখনও ইউএনও এবং পিআইও’র লোক পরিচয় দেন। সেই সাইফুল নির্মাণাধীন ৪০টি ঘরসহ শতাধিক ঘরের মালামাল সরবরাহ করেন। গৃহনির্মাণের সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার অনুপযোগী কাঠ ও বালু থেকে শুরু করে নিম্নমানের ইটসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ করেন। ঘর দেওয়ার কথা বলে কারও কারও কাছ থেকে নগদ টাকা নেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে সাইফুলের বিরুদ্ধে।
উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যমারচর গ্রামে পিআইও’র পছন্দের লোক হিসেবে ঠিকাদার সাইফুল এবং নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন কুমিল্লার নাছির ও ইসমাইল। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে সিন্ডিকেটের সদস্য নির্মাণ শ্রমিক নাছির ও ইসমাইল প্রকল্প এলাকা থেকে পালিয়ে যান। একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা কল রিসিভ করেননি।
জানা গেছে, মুজিববর্ষে জমি বন্দোবস্তসহ নতুন ঘর পাবে দিরাই উপজেলার ৭৪৬টি ভূমিহীন পরিবার। ৯টি ইউনিয়নের যাদের জমি আছে ঘর নেই, সরকারের ভূমিহীন ও গৃহহীনদের আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব পরিবারকে ঘর দেওয়া হবে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে বরাদ্দ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। ইটের দেওয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং টিনের ছাউনী দিয়ে তৈরি এসব সেমিপাকা ঘরে দু’টি শয়নকক্ষ, একটি খোলা বারান্দা, একটি রান্নাঘর এবং একটি শৌচাগার থাকছে। গত ২৩ জানুয়ারি দিরাইয়ের রাজানগর, করিমপুর ও চরনারচরে ৪০টি পরিবারকে জমি বন্দোবস্তসহ ঘর বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কে এম নজরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর উপহার আশ্রয়ন প্রকল্পের কাজ ডিসেম্বরের প্রথমদিকে শুরু করি। এ যাবত ৫০-৬০টি গৃহনির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। চলমান রয়েছে ২০০টি গৃহনির্মাণের কাজ।
নিম্নমানের কাজ ও বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। বর্তমান ইউএনও স্যারের তত্ত্বাবধানে ভালোভাবে কাজ করা হবে।
সাইফুল সিন্ডিকেট নিয়ে কথা বলতে রাজি নন জানিয়ে তিনি বলেন, তার মালামালের টাকা দিয়ে তাকে বিদায় করা হয়েছে। এর বেশি বলতে পারব না।