• ১৬ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ৭ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

বছরজুড়েই আন্তর্জাতিক চাপ

bijoy71news
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৫, ২০২৩
বছরজুড়েই আন্তর্জাতিক চাপ

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়’- মূলত বঙ্গবন্ধুর এই পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভর করেই চলছে বাংলাদেশ। তবে বিগত ৫২ বছরে পাল্টেছে বিশ্ব রাজনীতি, নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্য হিসেবেই দাঁড়িয়ে আছে কূটনীতি। এমন বাস্তবতায় ২০২৩ সালে বছরজুড়েই সরকারকে নানামুখী চাপ সামলাতে হয়েছে, যে ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। ভারত, চীন, রাশিয়া, মিয়ানমার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা এবং কূটনৈতিক তৎপরতায় বছরজুড়ে বাংলাদেশকে কী ধরনের চাপ সামলাতে হয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

অর্থনীতি-বাণিজ্য, সামাজিক-সাংস্কৃতিক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং বিভিন্ন অংশীদারিত্ব ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়বস্তু হিসেবে হয়ে উঠছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। লক্ষ্য করা যায় প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য, একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোরও স্বার্থ এই অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য। অর্থাৎ বাংলাদেশে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব নিয়ে একইসঙ্গে সতর্ক ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদ জানিয়েছেন সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের পরামর্শ দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে সামনে এনে এবং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে দেশের পররাষ্ট্রনীতি।

ঢাকা-ওয়াশিংটন

নির্বাচন ইস্যুতে ২০২৩ সালের ২৭ মে বাংলাদেশের উদ্দেশে নতুন ভিসানীতি আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই ভিসানীতিতে বলা হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া’কে বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে দায়ী বা জড়িত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। দেশের সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সরকারপন্থি ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা এই ভিসানীতির আওতায় রয়েছেন।

এর পরপরই গত জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া ঢাকা সফর করেছিলেন। দেশটির মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু’ও ছিলেন এই সফরে।

এরপর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষণা অনুযায়ী গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকেই এই নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এছাড়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে বৈঠক করেছেন এবং সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। দেশের সুশীল নাগরিক সমাজের সঙ্গেও ব্যস্ত সময় পার করেছেন তিনি।

 

একইসঙ্গে এ বছরের শেষে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রমনীতি। বিশ্বজুড়ে শ্রম অধিকার রক্ষায় গত ১৬ নভেম্বর নতুন নীতি ঘোষণা করে ওয়াশিংটন। এই শ্রমনীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যেসব দেশে বা যারা শ্রম অধিকার ক্ষুণ্ন করবেন, শ্রমিকদের ক্ষতি বা আক্রমণ করবেন তাদের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যনীতি ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেসময় উদাহরণ হিসেবে বিশেষ করে বাংলাদেশের নাম টেনে আনেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন।

এর ধারাবাহিকতায় গত ২০ নভেম্বর চিঠি পাঠিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস। পরবর্তী সময়ে ঢাকা এবং ওয়াশিংটনে বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের খবরও জানা গেছে।

এর আগে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা আনে পরাশক্তিধর এই দেশটি। সেসময় র‌্যাবের সাতজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্যাতনের অভিযোগে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গে বলেন, ‘তফসিল ঘোষণার পর এখনো যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে এটা তো সত্যি পিটার হাস পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে কয়েকবার মিটিং করেছেন। এছাড়া পশ্চিমা বিশ্বগুলোর এখন চ্যালেঞ্জ নিজেকে নিরপেক্ষ প্রমাণ করা। সবমিলিয়ে এটি স্পষ্ট যে আগামী ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি থাকছে।’

ঢাকা-ইউরোপীয় ইউনিয়ন

সেন্ট্রাল ইউরোপ ও মধ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেশিরভাগ দেশের সঙ্গেও বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে। দিল্লিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন শেষে গত ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকা সফর করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। তিন দশক পর বাংলাদেশে ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই সফরকে অংশীদারিত্বের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ঢাকা-প্যারিস।

ঢাকায় ইইউ’র মূল এজেন্ডা পোশাক খাত। শুল্কমুক্ত পণ্য হওয়ায় দেশের তৈরি পোশাক খাতের সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী ইইউ। তবে উন্নত দেশ হওয়ায় ইইউ’র সদস্য রাষ্ট্রগুলো বরাবরই বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার, সুশাসন এবং গণতন্ত্র নিয়ে সোচ্চার। একইসঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোতে মাতব্বরের ভূমিকায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করাই যেন তাদের রীতি। এরই ধারাবাহিকতায় লক্ষ্য করা যায় বাংলাদেশের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন যে তৎপরতা দেখাচ্ছে সেদিকেই হাঁটছে ইইউ।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শ্রমনীতি ঘোষণার পরপরই দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নানা ধরনের চাপ আসছে বলে জানিয়েছে পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এছাড়া গত ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশে নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ উল্লেখ করে সুষ্ঠু নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে জড়িত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দুই সদস্য।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব এবং রাষ্ট্রদূত তৌহিদ হোসেনের মতে, ‘এই অঞ্চলে পশ্চিমা বিশ্বের নীতি সুনির্দিষ্ট হয়েছে কি না সেটা নিশ্চিত হতে হলে দেশের জাতীয় নির্বাচনের পরে অন্তত ৬ মাস অপেক্ষা করতে হবে। তারা যে ধরনের থ্রেট করছে, সে অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হলে বুঝতে হবে কোনো সমঝোতা হয়েছে।’