বি৭১নি ডেস্ক :
এরই মধ্যে নির্বাচনী মাঠে কালো টাকা হিসেবে ১৪০ কোটি টাকার বেশি ছড়িয়েছে একটি চক্র। হুন্ডির মাধ্যমে এ অর্থের বড় অংশ এসেছে দুবাই থেকে। কালো টাকা ছড়ানোর সঙ্গে সংশ্নিষ্ট থাকার অভিযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করার দাবি করেছে র্যাব। জব্দ করা হয়েছে নগদ ৮ কোটি টাকা। এই চক্রের কাছে ১০ কোটি টাকার চেকও পাওয়া গেছে।
ভোটের চার দিন আগে মঙ্গলবার র্যাব ওই কালো টাকার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেফতারের কথা জানায়। র্যাব বলছে, কালো টাকার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট রয়েছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাবেক এপিএস মিয়া নুরুদ্দীন আহম্মেদ অপু। তিনি শরীয়তপুর-৩ (ডামুড্যা- ভেদরগঞ্জ-গোসাইরহাট) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এর আগে অপুর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গুলশানের আমেনা এন্টারপ্রাইজ, মতিঝিলের ইউনাইটেড কর্পোরেশন ও ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজে অভিযান চালায় র্যাব। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় তিনজনকে। তারা হলেন, ইউনাইটেড করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী হায়দার, আমেনা এন্টারপ্রাইজের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জয়নাল আবেদীন ও অফিস সহকারী আলমগীর হোসেন।
তিনটি প্রতিষ্ঠান কথিত আমদানি-রপ্তানি ও ঠিকাদারি ব্যবসা করে। জব্দ আট কোটি টাকা মিলেছে মতিঝিল সিটি সেন্টারের ইউনাইটেড করপোরেশন কার্যালয়ে। সেখানে অপুর ভোটের প্রচারপত্রও ছিল।
র্যাব জানায়- গ্রেফতাকৃতদের মধ্যে জয়নাল আবেদীন অপুর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। হাওয়াভবনে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। সেখানে তিনি কাজও করতেন। কালো টাকার সঙ্গে জড়িত আরো কয়েকজনকে খোঁজা হচ্ছে। তারা হলেন- ইউনাইটেড কর্পোরেশনের কর্ণধার মাহমুদুল হাসান ও ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের মালিক আতিকুর রহমান। মাহমুদ দীর্ঘ দিন স্বর্ণ চোলা চালানের সঙ্গে জড়িত। ধারণা করা হচ্ছে- বর্তমানে তিনি দুবাই রয়েছেন। আর আতিকুর রহমান ঝালকাঠি জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি।
আওয়ামী লীগ নেতারা অভিযোগ করে আসছেন, আসন্ন নির্বাচন প্রভাবিত করতে লন্ডনে বসে ষড়যন্ত্র করছেন তারেক। এজন্য তাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়েছে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই।
এর আগে ঢাকায় বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের দুই কর্মীকে টাকা ছড়ানোর অভিযোগে রোববার গ্রেফতার করে পুলিশ। একদিন পরই নির্বাচনী মাঠে ছড়ানোর অভিযোগে কোটি কোটি টাকার তথ্য মিলল।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর মতিঝিলের সিটি সেন্টারের ২২ তলায় এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, সোমবার রাত থেকে অভিযান চালিয়ে আট কোটি টাকা নগদ ও ১০ কোটি টাকার চেক উদ্ধার করেছি। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় টাকা ছড়ানো হয়েছে। মতিঝিলে ইউনাইটেড করপোরেশন ও ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ নামে অফিস খোলা হয়েছে। এই অফিসের বয়স দুই মাসের মতো। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কালো টাকা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়ানোর জন্য মূলত এ অফিস ভাড়া নেওয়া হয়েছে। দুই মাস আগেও এই অফিসটি মতিঝিলে একটি বড় রাজনৈতিক দলের অফিসের পাশে ছিল। নিরাপত্তার কারণে সেই অফিস সরিয়ে এখানে আনেন। এখন তারা এখানে এসে কাজ শুরু করেন।
বেনজীর আহমেদ আরো বলেন, দুই মাসে প্রায় দেড় শ কোটি টাকা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে। এর কথিত মালিক মাহমুদের অ্যাকাউন্টে এক মাসে ৭৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। কালো টাকার মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। পেশি শক্তির ব্যবহার, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এসব উদ্দেশ্য ছিল তাদের।
তিনি বলেন, আমরা সিটি সেন্টারে একজন রাজনৈতিক দলের কাগজপত্র পেয়েছি। তিনি হলেন- শরীয়তপুর-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপুন। তাকে সোমবার ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। পাঠানোর পরপরই সেখানে নির্বাচনী সহিংসতা হয়েছে। যেখানে যেখানে টাকা গেছে সেখানেই নির্বাচনী সহিংসতা ঘটেছে। তার মানে আমরা বলতে পারি এখন পর্যন্ত যেসব জায়গায় নির্বাচনী সহিংসতা হয়েছে সেখানে এই টাকার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন ক্যাশ বই আছে। সেখানে বিভিন্ন জায়গায় টাকা পাঠানোর স্লিপ আছে। দিনে কখনো ১১ কোটি, কখনো ২০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, টাকা এসেছে দুবাই থেকে হুন্ডির মাধ্যমে। এ ছাড়া স্থানী পর্যায় থেকেও সংগ্রহ করা হয়েছে। দুই মাসে আমরা ১৫০ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছি। তবে এ অফিসের লোকজন টাকার রেকর্ড বেশি দিনের রাখে না। তাই আমরা সব তথ্য পাইনি। জব্দ ইলেকট্রনিক ডিভাইস, রেজিস্টার পরীক্ষার পর লেনদেনের বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। এর মাধ্যমে ভয়াবহ অপচেষ্টাকে বানচাল করতে পেরেছি।
তিন বলেন, এ তদন্ত অব্যাহত থাকবে। জড়িতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। এত টাকা কোনো স্বাভাবিক টাকা হতে পারে না। এটা ‘ ইল গটেন মানি’। খারাপ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য পাওয়া এই অর্থ। আমরাও হুমকি ধামকি শুনে আসছি। এই হুমকির অন্যতম কারণ এই টাকা। হুমকি ধমকি যে অসত্য না তা এই লেনদেনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। হুমকি-ধামকির উৎস শত শত কোটি টাকা।
বেনজীর আহমেদ বলেন, ঢাকার একটি আসনের সব ভোটারের নাম-ঠিকানা সংবলিত একটি তালিকাও আলী হায়দারের অফিসে পাওয়া গেছে। এর মানে কি? এর মাধ্যমে বিশাল সংখ্যার ভোটারকে কেনার পরিকল্পনা করেছিল। কালো টাকা দিয়ে ভোট কিনে যদি কেউ এ দেশের ক্ষমতায় আসে তাহলে দেশের অর্থনীতির কি অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করব ৩০ তারিখ যেন একটা শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হয়।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাইলে বেনজীর বলেন, গ্রেফতার একজন বিশেষ ভবন তথা হাওয়া ভবনে কাজ করতেন।
বেনজীর আহমেদ বলেন, ইউনাইটেড করপোরেশনে অনেক ক্যাশবই ও বিভিন্ন ধরনের স্লিপ, ভাউচার পেয়েছি। তবে গত দুই মাসের চিত্রটা পুরোপুরি পেলে আমরা জানতে পারতাম, আর কাকে টাকা দেওয়া হয়েছে। তারপরও আমরা বিষয়টি তদন্ত করা হবে। গ্রেফতার তিনজনের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও সন্ত্রাস দমন আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে।