সিলেটে এবার বাণিজ্য মেলা আয়োজন নিয়ে চলছে যেন তুঘলকি কাজ কারবার। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বিবেচনার সুপারিশ কে পুঁজি করে সিলেট মেট্রোপলিন চেম্বারের বৈধ অনুমতিকে বাতিল করে দিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আর এসব কার্যকলাপের মূল হোতা হচ্ছেন নানা অনিয়মে নিমজ্জিত সিলেট চেম্বার অব কামার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির কিছু কর্মকর্তা। এমনটাই জানালেন এসএমসিসি’র কিছু কর্মকর্তা। সিলেট মেট্রোপলিন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি যথাযথ রীতিনীতি অনুসরণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি প্রেরণ করে মেলা আয়োজনের অনুমতি নেন। মেলা আয়োজনের প্রস্তুতিও শুরু হয়। খরচ হয় অনেক টাকা। কিন্তু আশ্চর্য্য হলেও সত্য যে, বর্তমানে হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গার মতো অবস্থার সৃষ্টি করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ভুক্তভোগীরা জানান, নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও স্বার্থপরতার বেড়াজালে বন্দি সিলেট চেম্বার অব কমার্সের দুরভিসন্ধিমূলক আচরণে সিলেটের মানুষের সুস্থ্য বিনোদনের ক্ষেত্র মেলা আয়োজনটি বিতর্কিত প্রশ্নবিদ্ধ ও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থানায় ২০১৮ সালের ২৭ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৬.০০.০০০০.১০৬.৮৬.০১২.১৭/২২৮ নং স্মারকে সিলেট মেট্রোপলিন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি কে চলতি বছরের ১ নভেম্বর সিলেটের শাহী ঈদগাহস্থ সদর উপজেলা খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমতি প্রদান করে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনুমোদন লাভের পর এসএমসিসআই কর্তৃপক্ষ সিলেটের জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার কে বিষয়টি অবহিত করে সহযোগিতা কামনা করেন। পাশাপাশি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদের কাছে লিখিত আবেদন করে শাহী ঈদগাহস্থ সদর উপজেলা খেলার মাঠ বরাদ্দ নেন। সিলেট মেট্রোপলিন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির মেলা অনুষ্ঠানের সকল আয়োজন যখন সম্পন্ন ঠিক তখনই খলনায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হয় সিলেট চেম্বার। তারা অর্থমন্ত্রীকে ভুল তথ্য দিয়ে একই স্থানে মেলা আয়োজনের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত আবেদনে অর্থমন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে নেন। মনিপুরী তাঁতী শিল্প ও জামদানি বেনারসি কল্যাণ ফাউন্ডেশন নামক ভুইফোঁর একটি সংগঠনের ব্যানারে নানা অনিয়মের মাধ্যমে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের অনুমতি নেওয়া হয়। শুধু তাই নয় স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সিলেট চেম্বার নানা মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তারা মেলা আয়োজনের রীতিনীতি লংঘন করে কোন প্রকার দরপত্র আহ্বান ছাড়াই মনিপুরী তাঁতী শিল্প জামদানি বেনারসি কল্যাণ ফাউন্ডেশনকে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব প্রদান করে। যে সংগঠনের কোন ভিত্তি নেই। মনিপুরী সম্প্রদায়ের নাম ব্যবহার করেন জৈনক হাজী আব্দুল গফফার এই সংগঠনের সভাপতি বনে যান। যা নিয়ে মনিপুরী সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। একজন মুসলিম ব্যক্তি হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের সংগঠনের প্রধান বলে প্রচার করায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। মনিপুরি সম্প্রদায়ের নেতারা দু’এক দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসক বরাবরে এ ব্যাপারে নালিশ জানাবেন। তাছাড়া এ প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচী সহ বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিচ্ছেন মনিপুরী নেতারা। সিলেট চেম্বার অব কমার্সের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে দায়েরকৃত একটি মামলায় ২নং বিবাদী ছিলেন বর্তমান সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ। তৎকালীন সময়ে চেম্বারের অনিয়ম দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে সে সময়কার চেম্বারের কমিটি বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ২০০৯ সাল ও ২০১৮ সালের মাঝে এখন মারাত্মক মিল খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে। সে সময়কার জুন্নুন মাহমুদ খান ও বর্তমানের হাজী আব্দুল গফফারের কর্মকান্ড যেন একই সূত্রে গাঁথা। এই যেন সেই পুরোনো প্রেতাত্মারা আজও চেম্বারকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজেরা লাভবান হচ্ছেন। এদিকে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স যথা সময়ে ও যথাযথ নিয়মে আবেদন করে মেলার অনুমতি পেলেও সিলেট চেম্বার ত্র“টিযুক্ত আবেদনে মেলার অনুমতি পেয়ে যায়। এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এ.কে.এম আলী আহাদ খান ৪ সেপ্টেম্বর সিলেট চেম্বারে প্রেরিত এক পত্রে উল্লেখ করেন, সিলেট চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রি কর্তৃক ১ অক্টোবর থেকে মাসব্যাপী সিলেট সদর উপজেলা শাহী ঈদগাহ খেলার মাঠে ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে সিলেট আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আয়োজনের নিমিত্তে আবেদন করেছেন। কিন্তু ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছর ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে বিধায়, পুরাতন অর্থ বছরের মেলা বর্তমান অর্থবছরে সম্পন্ন করার কোন সুযোগ নেই।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাণিজ্য মেলা আয়োজনকে কুক্ষিগত করে রাখতে চরম অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন সিলেট চেম্বার। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কাল্পনিক ও সম্পূর্ণ অবৈধ সংগঠনকে অনিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ইভেন্ট ম্যনেজমেন্ট নিয়োগ করেছেন। যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার শামিল।
এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরী জামান জানান, সিলেটে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সিলেট চেম্বার অব কমার্সকে অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। যে কারনে সিলেট চেম্বার অব কমার্স মেলা আয়োজনের অনুমতি লাভ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে সিলেট মেট্রাপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড এন্ডাষ্ট্রির সভাপতি মো. হাসিন আহমদ জানান, আমাদেরকে অনুমতি দিয়ে আয়োজনের শেষ মূহুর্তে বাণিজ্য মেলা আয়োজন বাতিল করে দেওয়ায় আমরা চরম ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। আমরা যথারীতি আবেদনের মাধ্যমে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের অনুমতি লাভ করি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে কোন প্রকার ত্র“টি বা অভিযোগ ছাড়াই আমাদের মেলা বাতিল করে দেওয়া হল। যে কারনে ইতোমধ্যেই আমরা যে সব স্টল মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছিলাম, তাদের কাছে আমরা এখন কোন জবাব দিতে পারছি না। অবকাঠামো ও ডেকোরেশনের জন্য আমরা বিপুল অংকের টাকা খরচ করে ফেলেছি। এ অবস্থায় আমাদের যাওয়ার রাস্তা নেই। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। আমরা মাঠের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। সব কিছু উপযোগী করে তোলার পর আমাদেরকে বঞ্চিত করা হলো।