নুরুল হক শিপু :
একজন উদ্যমী ছাত্র। সেই ছাত্রজীবনেই জাতীয়ভাবে পরিচিতি লাভ। তৎকালিন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়া সেই ছাত্রনেতা হলেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। সিলেটের ইতিহাসে সত্যিই তিনি একজন বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী নেতা। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির মাঠে তিনি যেমন আলোচিত, সফল তেমনি তাকে নিয়ে টুকটাক সমালোচনা আছে।
নুরুল ইসলাম নাহিদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে ষাটের দশকে। শুরুটা হয় আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে। নাহিদ তখন দেশ কাঁপানো তোখড় এক ছাত্রনেতা। তিনি ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানসহ সে সময় সকল রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ছাত্রজনতাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামন থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে দেশ-বিদেশের সকল গণমাধ্যমের সামনে দেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলে আলোচনায় আসেন। ছাত্রনেতা থাকাবস্থায় সান্নিধ্য পেয়েছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তৎকালীন ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে গেরিলা বাহিনী সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান জাতি স্মরণ রাখবে চিরকাল। ‘ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় (স্টিয়ারিং) কমিটির সদস্য ছিলেন।
নাহিদ ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৩ সালে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
নুরুল ইসলাম নাহিদ ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন।
নুরুল ইসলাম নাহিদ ১২ জুন ১৯৯৬ সালের ৭ম, ২০০৮ সালের ৯ম, ২০১৪ সালে দশম ও ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাচনী আসন সিলেট-৬ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ৬ জানুয়ারি ২০০৯ সালে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পান। এখন এই দায়িত্বে আছেন।
শিক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা ও অবদানের জন্য ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন কংগ্রেস’ বিশ্ব সম্মেলনে ২০১২ সালে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে ‘পরিবর্তনের অগ্রদূত’ আখ্যায়িত করে ‘World Education Congress Global Award for outstanding contribution to Education’ পদকে ভূষিত করা হয়।
পুরষ্কারেই শেষ নয় অনেক প্রাপ্তির মধ্যে নুরুল ইসলাম নাহিদকে নিয়ে সমালোচনাও কম ছিলো না। ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে বাংলাদেশে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটে। এসকল ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নাহিদ সারাদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হন। নাহিদ পরবর্তীকালে প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের শাস্তির বিষয়ে যে বিদ্যমান আইন রয়েছে তা আরো সংশোধনের জন্য ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান।
২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর এক সরকারি অনুষ্ঠানে নিজের ও মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের দুর্নীতির স্বীকারোক্তি করে নাহিদ বলেন, “আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা ঘুস খাবেন, তবে সহনশীল হইয়া খাবেন। অসহনীয় হয়ে বলা যায় আপনারা ঘুস খাইয়েন না, এটা অবাস্তবিক কথা হবে। নানা জায়গায় এ রকম হইছে, সব জায়গাতেই এ রকম হইছে। খালি যে অফিসার চোর, তা না, মন্ত্রীরাও চোর। এই জগতে এ রকমই চলে আসতেছে।” সকল আলোচনা-সমালোচনা ছাপিয়ে নুরুল ইসলাম নাহিদ আজ জাতীয় নেতাদের একজন। এবারও তাঁকে সিলেট-৬ আসনে নৌকার মাঝি হিসেবে দেখা যাবে। একই সাথে আওয়ামী লীগ পূনরায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে নাহিদকে বুঝিয়ে দেয়া হবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়!-এমনটিই জানিয়েছে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণীদের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র।
নুরুল ইসলাম নাহিদ একজন ভালো মানের লেখকও। তাঁর লেখা ‘বাঙালি রুখে দাঁড়াও’ (২০০৬), ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, লক্ষ্য ও সংগ্রাম’ (২০০৭), ‘রাজনীতির সুস্থধারা পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম’ (২০০৯), ‘শিক্ষানীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ (২০০৯), বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও গণতন্ত্রের পথ পরিক্রমা (২০১০) সালে প্রকাশিত হয়। নাহিদোর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য বহু বিষয়ে বিশ্লেষণমূলক কয়েক শ’ নিবন্ধ বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দৈনিক পত্রিকা এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায় এখনো নিয়মিত কলাম লেখেন।
১৯৪৫ সালের ৫ জুলাই সিলেট জেলার বিয়ানীবাজারের দক্ষিণ নয়াগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নাহিদ। তিনি মাে. আকদ্দস আলী ও জয়তুরা খাতুনের সন্তান। বিয়ানীবাজারের কসবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে নাহিদের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। এরপর বিয়ানীবাজার পঞ্চখন্ড হরগোবিন্দ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ সম্পন্ন করের।
তার স্ত্রী জোহরা জেসমিন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। এই দম্পতীর দুই মেয়ে, নাদিয়া নন্দিতা ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও নাজিয়া সামানথা ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।