• ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ২৪শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

জলবায়ু কূটনীতিতে গতি আনবে যুক্তরাষ্ট্র

bijoy71news
প্রকাশিত এপ্রিল ১০, ২০২১
জলবায়ু কূটনীতিতে গতি আনবে যুক্তরাষ্ট্র

বি৭১নি ডেস্ক ::
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত প্যারিস চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাবর্তন জলবায়ু পরিবর্তন কূটনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করবে। শুক্রবার গণভবনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জলবায়ু সংক্রান্ত বিশেষ দূত জন কেরির সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ দিন ঢাকায় এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জন কেরি বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ উদারতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু এজন্য বাংলাদেশকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের দেখাশোনার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের একার নয়।
২২-২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় ভার্চুয়াল লিডার্স সম্মেলনে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানোয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমন্ত্রণ গ্রহণ করায় তাকেও ধন্যবাদ জানান জন কেরি। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা নিঃসরণকারী (কার্বন) নয় এবং নিঃসরণে যাদের অবদান নগণ্য, তারাও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে তিনি বলেন, তার দেশের উন্নয়নের জন্য জ্বালানি প্রয়োজন। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আঞ্চলিক ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় উপায়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য কথা বলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু রচিত কারাগারের রোজনামচা ও অসমাপ্ত আত্মজীবনী (ইংরেজি সংস্করণ) এবং সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেনস ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন, বাংলাদেশ : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সিরিজের বই জন কেরিকে উপহার দেন শেখ হাসিনা।
বৈঠকে জন কেরি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সবুজ জলবায়ু তহবিলের এক মিলিয়ন ডলার ছাড়াও দুই মিলিয়ন ডলার দেবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ চাইলে তারাও বাংলাদেশকে কোভিড-১৯ এর টিকা দিতে পারে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্রে গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে টিকা উদ্বৃত্ত হবে।
এদিকে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জন কেরি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিকতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে তা প্রশংসনীয়। এ সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় কাজ করে যাবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নিজেও মিয়ানমারের প্রশাসনিক রাজধানী নেপিদো গিয়েছিলেন বলে কেরি উল্লেখ করেন। দেশটির জেনারেলদের সঙ্গে তিনি বৈঠকও করেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমার সরকার ভিন্ন পথে হাঁটছে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনও বিষয়টি নজরে রাখছেন। মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরে আসলে সবকিছু করা যাবে। জন কেরি আরও বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বড় সংকটে পড়েছিল। তাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ উদারতার পরিচয় দিয়েছে। এজন্য বাংলাদেশকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট দেখাশোনার দায়িত্ব শুধু বাংলাদেশের একার নয়। সংকট সমাধানে বিশ্ববাসীকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। সমস্যার সমাধানে দায়িত্ব নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাতে তার এ ঢাকা সফর। তিনি বলেন, বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে বাইডেন প্রশাসন এরইমধ্যে জলবায়ুবিষয়ক প্যারিস চুক্তিতে ফিরেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য জলবায়ু বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে সবাইকে কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ু সংকট রোধে অর্থায়ন সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্র সবার সঙ্গে কাজ করবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো দেশ এককভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারে না। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যু এ শিক্ষা দিয়েছে। দেশগুলোকে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। এসব বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বারাক ওবামার শাসনামলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী জন কেরি আরও বলেন, সম্প্রতি বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যা, বরফ গলা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঘটনা ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অভিবাসনও ঘটছে। এসব মোকাবিলায় সবাইকে পদক্ষেপ নিতে হবে। ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি মোকাবিলা করতে ২০৩৫ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। দূষণের শিকার দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান প্যারিস চুক্তিতে রয়েছে। এ ব্যাপারে ধনী দেশগুলো তাদের অঙ্গীকার পূরণ করছে না- এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জন কেরি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার পূরণে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন অবশ্যই করতে হবে।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাইডেনের ডাকে অনুষ্ঠেয় আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেবেন। গ্লাসগোতে আগামী কোপ-২৬ এ যোগ দেবে বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত ১০০ বিলিয়ন ডলার তহবিলের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ মনে করে, এ তহবিলের ৫০ শতাংশ পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং ৫০ শতাংশ দুর্ভোগ লাঘবে ব্যয় করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের পাহাড় ও বনজ সম্পদ নষ্ট হয়েছে। এসবের জন্য বাংলাদেশকে সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। রোহিঙ্গাদের কার্যকর প্রত্যাবাসনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ড. মোমেন।
শুক্রবার সকালে ভারতের দিল্লি থেকে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ উড়োজাহাজে জন কেরি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন। এ সময় তাকে অভ্যর্থনা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ও তার স্ত্রী সেলিমা মোমেন। কয়েক ঘণ্টার সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাইডেন জলবায়ু বিষয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্র তুলে দেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামী ২২ ও ২৩ এপ্রিল জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছেন। এতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের ৪০ দেশের রাষ্ট্র কিংবা সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সরে আসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সমস্যাকে কার্যত অস্বীকার করেছিল। বাইডেন ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশে ফের জলবায়ু চুক্তিতে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর এই ইস্যুতে মহামারির মধ্যে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছেন বাইডেন। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অন্যতম। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের সভাপতি বাংলাদেশ। পদাধিকারবলে প্রধানমন্ত্রী এ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।