• ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ , ২৪শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী

bijoy71news
প্রকাশিত মার্চ ১৩, ২০২১
দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী

বি৭১নি ডেস্ক ::
রাজধানীর তিনটি হাসপাতাল ঘুরেও ভর্তির সুযোগ পাননি ফেরদৌসী বেগম। বৃহস্পতিবার উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে তার করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। বাসায় মাথাঘুরে পড়ে গেলে তাকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে কোভিড-১৯ পজিটিভ আসায় কর্তৃপক্ষ তাকে কোভিড হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে।
এরপর রোগীর স্বজনরা তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) খালি নেই বলে সেখানে রাখা হয়নি। গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে নিয়ে গেলে তারাও রোগীকে ফিরিয়ে দেয়।
এ প্রসঙ্গে ফেরদৌসী বেগমের ছেলে খোকন মৃধা বলেন, উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে মায়ের সিটিস্ক্যান করে একটি ছোট স্ট্রোক পাওয়া গেছে। স্ট্রোক ও কোভিড-১৯ পজিটিভ হওয়ায় মাকে কোনো সরকারি হাসপাতালে ভর্তি নিচ্ছে না। আমার পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে মায়ের চিকিৎসা চালানো এক প্রকার অসম্ভব।
তবে এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশে নতুন করে করোনা রোগী বাড়ার পর থেকেই বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে অনীহা দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ইতোমধ্যে কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোকে আগের মতো চিকিৎসা সেবা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোয় এ নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে না। তবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি ‘কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি’।
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) এবং কোভিড-১৯ সংক্রান্ত মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই বলে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজনে রোগীকে জরুরি বিভাগে ভর্তি করে সেবা দিতে হবে। কোভিড রোগী পথে পথে ঘুরবে আর সরকারি হাসপাতালে ভর্তি নেবে না-এটা মেনে নেওয়া যায় না। তিনি বলেন, রোগী বৃদ্ধির শুরুতেই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সব কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালকে আগের মতো সেবা দিতে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।
এদিকে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। টানা তৃতীয় দিনের মতো হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে এক হাজার ৬৬ জনের করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এ পর্যন্ত শনাক্ত কোভিড-১৯ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে হয়েছে পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার ২২২ জন। অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। দৈনিক শনাক্তের হার সর্বশেষ এর চেয়ে বেশি ছিল ৫ জানুয়ারি। সেদিন পরীক্ষার তুলনায় রোগী শনাক্তের হার ছিল ৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এরপর কমতে কমতে তা ৩ শতাংশের নিচে নেমেছিল। তবে মার্চের শুরু থেকে সংক্রমণ বাড়তে থাকে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে গেল ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা আট হাজার ৫১৫ জন। ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১১৮টি আরটি-পিসিআর ল্যাব, ২৯টি জিন-এক্সপার্র্ট ল্যাব ও ৭২টি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ল্যাবে অর্থাৎ সর্বমোট ২১৯টি ল্যাবে ১৬ হাজার ১১১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ৪২ লাখ ৩২ হাজার ১৩৯টি নমুনা। এই সময়ে নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৯১ দশমি ৭১ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচিপ সভাপতি অধাপক ডা. এমএ আজিজ বলেন, দুমাস ধরে করোনা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সম্প্রতি সেটি বাড়তে শুরু করেছে। অধিদপ্তর কিছুটা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আমি মনে করি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আবারও কিছুটা কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, দেশের সব শ্রেণির জনসাধারণের মধ্যে স্বাস্থবিধি মানার প্রতি শিথিলতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যেতে পারে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান এবং সব ধরনের যানবাহনে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিধান করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সরকারের নতুন করে ভাবতে হবে। তা ছাড়া দৈনিক দশ লাখ টিকাদানের সক্ষমতা থাকলেও প্রতিদিনই টিকাদানের পরিমাণ কমছে। এ অবস্থায় দ্রুততার সঙ্গে টিকাদান বাড়াতে হবে এবং ন্যূনতম বয়সের ক্ষেত্রে ৪০ বছরের বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দিতে হবে। কারণ, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ৪০ বছরের নিচে।
দেশে গত বছর ৮ মার্চ করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার এক বছর পর গত ৭ মার্চ শনাক্ত রোগীর সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে গত বছরের ২ জুলাই চার হাজার ১৯ জন কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়, যা একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত। প্রথম রোগী শনাক্তের ১০ দিন পর গত বছরের ১৮ মার্চ দেশে প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ বছর ১১ মার্চ তা সাড়ে আট হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে গত বছরের ৩০ জুন একদিনেই ৬৪ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়, যা ছিল একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু।