বি৭১নি ডেস্ক ::
নাটকের কোনো কিছুই যেন নিয়মে আটকানো যাচ্ছে না। নিয়ম ভাঙার খেলায় মেতেছেন নাট্যাঙ্গনের মানুষেরা। বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও কেউই শৃঙ্খলা মেনে কাজ করছেন না। এ নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিড়ম্বনা। গত বছরের শেষ দিকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নাটকের শুটিং চলমান রেখেছেন অনেক নির্মাতা। কিন্তু বাস্তবে করোনা সচেতনতার কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না কারও। এ নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে।
২০১৯ সালের শেষ প্রান্তে চীন থেকে আবির্ভাব হয় প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের। ২০২০ সালের মার্চে বাংলাদেশে এটি প্রথম শনাক্ত হয়। প্রথম আক্রান্ত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারিভাবে লকডাউন দেওয়া হয়। এরপর থেকে অন্য সেক্টরের মতো শোবিজের কাজও বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের লকডাউন কাটিয়ে দেশের অন্যসব কিছুর মতো বিনোদন জগৎও কর্মমুখর হয়।
কিন্তু তার আগে সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার শর্তে শুটিংয়ের অনুমতি দেওয়া হলেও হাতেগোনা কয়েকজন নির্মাতা সেটি অনুসরণ করেন। বেশিরভাগই স্বাস্থ্যবিধি তো দূরের কথা, নাটকের সংগঠনগুলো কর্তৃক নির্ধারিত কোনো নিয়ম কানুনেরও ধার ধারেননি। এর ফলে শুটিং স্পটগুলো হয়ে ওঠে করোনা সেল। নাটকের শীর্ষ অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, অভিনেত্রী তানজিন তিশাসহ অনেকেই শুটিং স্পট থেকেই করোনায় আক্রান্ত হন। এ ছাড়া অনেকেই করোনার উপসর্গ নিয়েও শুটিং করেছেন। এ নিয়ে নাট্যাঙ্গনের পেশাদার শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে ক্ষোভ লক্ষ করা গেছে।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রাক্কালে অভিনয়শিল্পী শহীদুজ্জামান সেলিম, আফসানা মিমি, রোজী সিদ্দিকী, আহসান হাবিব নাসিমসহ আরও কয়েকজন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হন। এহেন পরিস্থিতিতে শুটিং স্পটে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে কাজ করতে না পারলে শুটিং বন্ধ রাখার দাবি উঠেছে পেশাদার অভিনয়শিল্পীদের মধ্য থেকে। এ বিষয়ে অভিনেতা জাহিদ হাসান বলেন, ‘প্রথমদিকে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সবার মধ্যে বেশ আগ্রহ দেখা গেলেও চলতি বছর লকডাউনের আগ পর্যন্ত সেসবের কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি। তাই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় নিয়েই শুটিং করতে হয়েছে। কারণ অভিনয় আমার পেশা। কত দিনই ঘরে বসে থাকব। তবে নাটকসংশ্লিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করছি।’
শুটিং করতে গিয়েই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। তিনি বলেন, ‘শুটিং স্পটে আমার পুরো সময় কাটে। বাসায় গিয়ে শুধু বিশ্রাম নিই। অনেকের নিষেধ সত্ত্বেও আমাকে শুটিং করতে হয়েছে। কারণ আমি যদি শুটিং না করি তাহলে অনেকের উপার্জন বন্ধ হয়ে যাবে। সেই চিন্তা থেকেই করোনার মধ্যেও শুটিং করছি। তবে এখন আমি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই শুটিং করার চেষ্টা করছি। তারপরও অরক্ষিত থাকে শুটিং স্পট। মাস্ক পরে তো আর শট দেওয়া সম্ভব নয়। তাই এ নিয়ে সবার আরও সচেতন হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’
করোনার অনিয়ন্ত্রিত সংক্রমণ নিয়ে এ রকম অনেক অভিনয়শিল্পীই উদ্বিগ্ন। কেউ কেউ করোনার ভয়ে শুটিং করাই বন্ধ করে দিয়েছেন। তারপরও টিভি চ্যানেলগুলোর চাহিদার কারণে বৈরী পরিবেশেও নির্মাতা ও অভিনেয়শিল্পীরা কাজ করে যাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে ডিরেক্টরস গিল্ডের সভাপতি সালাউদ্দিন লাভলু বলেন, ‘শুটিং স্পটে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না তার জন্য আমাদের একটি মনিটরিং সেল আছে। তারা নিয়মিত শুটিং স্পটে গিয়ে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করছেন। কোনো অভিনয়শিল্পী কিংবা কলাকুশলী করোনায় আক্রান্ত হলেই বলা হচ্ছে শুটিং স্পট থেকে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন। আমার কাছে এটি গ্রহণযোগ্য অভিযোগ বলে মনে হয়নি। কারণ শিল্পীরা শুটিং ছাড়াও অন্য কোথা থেকে আক্রান্ত হতে পারেন। শুটিংয়ের সময় তো অভিনয়শিল্পীর মুখে মাস্ক দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে শুটিং স্পটে প্রবেশের সময় হ্যান্ড স্যানিটাইজ করা এবং ক্যামেরা বন্ধ থাকা অবস্থায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর বেশি আর কিই-ই বা করার আছে। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি মনে হয় আমার কাছে।’
নাটক নির্মাণ হয় যেসব শুটিং বাড়িতে সেসব বাড়ির মালিকরাও অভিযুক্ত করছেন নির্মাতাদের। তাদের মতে, একটি নাটকের কাজ শেষ করার পর অনেকেই শুটিং হাউস নোংরা করে যান, যা পরে শুটিং ইউনিটের জন্য ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে চলতে থাকলে হাউস পরিচালনা করা খুব কষ্ট হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন বাড়ির মালিকরা। এদিকে নাটকের সংগঠনগুলো থেকে সরকার ঘোষিত লকডাউন মেনে চলার পরামর্শ দিলেও শুটিং বন্ধ রাখার কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। বরং বলা হয়েছে যারা মনে করছেন নিজেদের সুরক্ষা বজায় রেখে শুটিং করতে পারবেন, তারা শুটিং করবেন। এ অবস্থায় লকডাউনেও অনেকেই শুটিং চালিয়ে যাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এমন একাধিক ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা পুলিশের অনুমতি নিয়ে শুটিং করার কথা জানিয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মানা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়।